স্নিগ্ধ মিতভাষণ

নগরবাসী মানুষ উন্নয়নের পীড়ন অনুভব করছে প্রতিনিয়ত। তার চোখের কাছে প্রতিদিন পুরনো ভূমিলগ্ন আবাস ভাঙছে, নতুন পরিপাটিময় সুউচ্চ দরদালান উঠছে। সমতলে আদিগন্ত দেখার আনন্দ, এখন স্মৃতির মধ্যে বিরাজ করছে। আকাশচুম্বিতার আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। বিচিত্রভাবে জ্যামিতিময় পরিসরে আমাদের গতায়ত। আমরা চোখ মেললেই দেখি ত্রিকোণ, চৌকোণ এবং গাণিতিক শুদ্ধতায় টানা কত না ডিজাইন। আমাদের আকাশও আজ ছককাটা। মহানগরবাসী দৃষ্টি গলিয়ে ত্রিকোণ, চৌকোণ আকাশ দেখে তার আবাস থেকে। এই অভিজ্ঞতার স্নিগ্ধ প্রকাশ আনিসুজ্জামানের ছাপচিত্র – উডকাট।

শুরুতে আনিস অনেক কর্কশ শব্দ শুনেছিলেন। ছেঁড়া-ফাঁড়া জীবনের জর্জরিত রূপেই আবিষ্ট হয়েছিল তাঁর ধ্যান। তখনো তাঁর কাজে উদ্ভিদপ্রধান প্রকৃতির অনুষঙ্গ ছিল; ছিল মধ্যবিত্তের অনুচ্চ জীর্ণ দালান আর হতদরিদ্র মানুষের বস্তির কুৎসিৎ চিৎকৃৎ রূপের কোলাহল। আনিস উডকাটের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সহস্রভাবে বিকিরণময় বস্তু ও মানুষের জীবন ধরতে চেয়েছেন। কাষ্ঠখণ্ড নানাভাবে চিড়ে জ্যামিতিক বৈচিত্র্য অন্বেষণ করেছেন এই শিল্পী।

প্রথমে আনিস উচ্চগ্রামে বাজিয়েছেন। ক্ষয়ে-যাওয়া দেয়াল, নতুন সিমেন্টের চাপড়-দেওয়া দেয়াল, নানা নির্মাণসামগ্রী, কাঠের তক্তা, লোহার রড, শ্রমিকের বাঁশের ঝুপড়ি ইত্যাদি মিলিয়ে জটিল ফর্মের আবেশ তৈরি হয়েছিল। তারপর গ্রামের সাঁকো, নির্মাণাধীন দালানে বাঁশের সিঁড়ি এসবের দিক দিয়ে তাকিয়ে তীর্যক রেখার নির্ভরতায় স্পেসে গভীরতা খুঁজে পেয়ে নতুন কম্পোজিশন রচনা করলেন আনিস। কাঠ কাটার দক্ষতাও তাঁর বেড়ে চলল সেইসঙ্গে। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা গভীর অনুশীলনে আয়ত্ত করায় তিনি সমৃদ্ধতর হয়েছেন। আনিসের ছাপচিত্রের শিক্ষা-দীক্ষার শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। অবশ্য তাঁদের সময়ে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ছিল। এ প্রতিষ্ঠানের ছাপচিত্রচর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘকালের। আর এই মাধ্যমের হিসাবটা যদি দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে মেলে ধরা যায় তবে তা বুঝতে সুবিধা হবে। আদিগুরু সফিউদ্দীনই পথ দেখিয়েছেন। জয়নুলের সহযোদ্ধা এই শিল্পী কলকাতার সরকারি স্কুল থেকে এবং পরবর্তী সময়ে লন্ডনে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষালাভ করেছেন, কিবরিয়া জাপানে, রফিকুন নবী গ্রিসে, মনিরুল ইসলাম স্পেনে, মাহমুদুল হকও জাপানে, এভাবে অনেক দেশের শিক্ষা-দীক্ষায় অভিজ্ঞ অনেক শিল্পীর কাজ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে আজ। সত্তর-আশির দশকের প্রজন্মের অনেকে চীন ও ভারতে গিয়েও শিক্ষিত-দীক্ষিত হয়েছেন। ছাপাই ছবির এই পরম্পরার মধ্য দিয়ে নিজেকে চালিত করে স্বতন্ত্র-বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বলতর হয়ে আছেন সাঁইত্রিশ বছরের আনিস। দেশের প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে আনিস স্নাতকোত্তর করেন ভারতের রবীন্দ্রভারতী থেকে। যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো ও লন্ডনে ছয়মাসের রেসিডেন্সি সেরে তারপর আবার জাপান এবং সেখানে বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান তামা আর্ট ইউনিভার্সিটিতে পুনরায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। সুখ্যাত শিক্ষক কেইসিই কোবায়াসির কাছে হাতেখড়ি এবং তাঁকে উজ্জীবিত করেন প্রবীণ শিক্ষক ফুমিয়াকি ফুকিতা। গত শতকের ষাটের দশকের এই গুরুরাই জাপানি ছাপচিত্রে রেনেসাঁসের জন্ম দিয়েছেন।

আমার মনে হয়েছে আনিসের একটা নতুন দৃষ্টিলাভ ঘটেছে গ্লাসগোর রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ায়। এখান থেকেই তিনি উডকাটে কীভাবে আরো পরিশীলিত, পরিপাটিত ভাব অক্ষুণ্ন রাখা যায় তা আয়ত্ত করে ফেলেন। প্রিন্টের বড় কথা নিখুঁত নিকোনো পরিবেশনা। এ শিল্পী এ বিষয় পশ্চিমের হিসেবে একভাবে অর্জন করেছেন, আবার জাপানে এসে প্রাচ্যদেশীয় নিয়মে ভিন্নভাবে লাভ করেছেন। আনিসের কাজে যে আমরা বিস্মিত চোখে শুচিতা, শুভ্রতাকে অবলোকন করে চোখের তৃষ্ণা মেটাচ্ছি তার বড় উৎস জাপান – জাপানিয়া নন্দনতত্ত্ব। এর সঙ্গে অবশ্যই মিলেমিশে আছে স্বদেশ, পাশের দেশ ভারত, ইংল্যান্ডও।

কিন্তু পরিণামে আনিস কর্কশতা ছেড়ে দিলেন। উচ্চগ্রামের দিকে তাঁর রং, ফর্ম ও পরিচর্যা আর অগ্রসর হলো না। মিহি থেকে মিহিতর হলেন তিনি। নিবিষ্ট কানে নিরুপদ্রব নীরবতায় তাঁর সেই কাঠের অন্তরগত বিচিত্র সুরজালের সংগীত এখন আমরা শুনছি। তাঁর ছবির আবেশ এখন আমাদের চোখের সামনের বাস্তবতাকে জানান দেয় না। তা মেলে ধরছে অন্তর্লোকের বাস্তবতা। যদিও তাঁর চিত্রপরিমার্জনার প্রধান লক্ষণ সেই স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য বা আর্কিটেকটনিক কম্পোজিশন এখনো বিদ্যমান। তবে স্থাপত্য সম্বন্ধে সেই প্রিয় প্রবাদ – আর্কিটেকচার ইজ ফ্রোজেন মিউজিক, তা গড়ন ও কাঠামোর মাহাত্ম্য ছাড়িয়ে টেক্সচার বা বিন্দুর বুনটের হিমসংগীত হয়ে পড়েছে আনিসের কাজে। একজন দ্বিমাত্রিক স্পেসের শিল্পীর গন্তব্য শত স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও ভিন্নতর হয়ে যেতেই পারে।

মানুষ প্রায়শ শোধিত অবস্থার দিকে ধাবিত হতে চায়। শিল্পী আনিস স্বভাবতই তা আরো বেশি করে প্রত্যাশা করেন। যে নির্মাণাধীন দালানকোঠা ছিল তাঁর প্রধান বিষয় সেটা এতোটা পরিশুদ্ধির মর্ম কোত্থেকে খুঁজে পেল তা বলতে গেলে আনিসের চলার পথটা আবারো বিশ্লেষণ করতে হয়। গ্লাসগো ও লন্ডনে তিনি পশ্চিমের নগর দেখেছেন। পশ্চিমে সুউচ্চ পুরনো দালান সংস্কার হওয়ার পর নতুন হয়ে ওঠে। আর এই সংস্কারকাজও চলে সাজানো-গোছানোভাবে। নতুন দালান ওঠা কিংবা পুরনো দালানের সংস্কার জাপানেও চলে নির্মাণসামগ্রী, যতটা পারা যায় সযতনে পরিচ্ছন্ন রেখে। পশ্চিম ও দূরপ্রাচ্যের এই সুচারু নিয়মের পাশে তৃতীয় বিশ্বের অপরিকল্পিত বস্তি ও দালানের সহাবস্থানের মহানগরীর নির্মাণাধীন অবস্থা জটিল ও বিশৃঙ্খল। সব জঞ্জাল ও বিশৃঙ্খলা থেকে আনিস যেন উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন। কিংবা ক্যায়স বা বিশৃঙ্খলার কোলাহল যেন তাঁর কাজে শমিত হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে সুমিতির জ্যামিতির জন্য ভুবনবিখ্যাত জাপানের নন্দনতত্ত্ব এ শিল্পীর মনে বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে। আমাদের দেশের সৌন্দর্যভাবনা আর জাপানিয়া নন্দনতত্ত্বের মিথস্ক্রিয়ায় কিবরিয়া, গিয়াসসহ আরো কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পী তাঁদের সৃষ্টিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। শিল্পমাত্রই বহুদেশের নান্দনিকতার মেলবন্ধন। আনিস উডব্লক প্রিন্টে আবারো তা প্রমাণ করলেন। তাঁর কাজে আশ্চর্যান্বিত স্নিগ্ধতা এসেছে। আগে তাঁর কাজে কর্কশ নগ্ন-কংক্রিট ভেদ করে বিভিন্নমুখী লোহার রড যেভাবে সংক্ষুব্ধ ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করত সেই ভাব আর নেই। বেঙ্গল গ্যালারিতে আয়োজিত আনিস সেই ফ্রোজেন মিউজিককে আরো বেশি হিমেল আবেশে আবৃত করেছেন। আর্কিটেকচারের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে টেক্সচার। বাঁকানো ধাতব কঠিন শিক এখন মনে হয় উদ্ভিদ প্রকৃতির অনুষঙ্গ; যেন কোনো বর্ধিষ্ণু লতা। আনিস লতিয়ে উঠে ললিত হয়েছেন। ফিরে এসেছেন সমতলীয় জ্যামিতিক দেহের কম্পোজিশনে। সব জায়গায় সুর রয়ে গেছে। দালানে ও বৃক্ষময় নিসর্গে। সেই সুরকেই বাঁধেন শিল্পী, রচনা করেন বিরচন বা কম্পোজিশন। কাঠের পিঠ আনুভূমিক, লম্বিক ও তীর্যক করে কেটে এবং এই বহুমুখী কর্তনের পারস্পরিক সন্নিপাতে শুধু সবুজাভ আবহের বুনিয়াদ গড়েছেন আনিস। আর এই বুনিয়াদের ওপর জ্যামিতিক – জমাট তল ও রেখার সম্মিলন। কখনোবা তা বাদ্যযন্ত্রের তারের মতো ঝুলে-থাকা অনুষঙ্গ, কখনো স্পষ্টত জানালা বা অন্য কোনো স্থাপত্যের অঙ্গপ্রতঙ্গের মতো। কিন্তু সবই দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ। ভারসাম্য, স্নিগ্ধতা, কখনোবা পরিচিত বস্তুর অতীত নিরপেক্ষ জ্যামিতি; – এসবই মগ্ন চোখে আনিসুজ্জামানের উডকাঠ প্রিন্টে দেখার বিষয় হয়ে ওঠে। পরিমিতি আর মিতভাষিতার এক নতুন গন্তব্যে পৌঁছেছেন তিনি। এ আয়োজনে জাপান তাঁকে সহজ শর্তে বিপুল ঋণ দিয়েছে। তবে জাপানি নান্দনিকতাকে আলিঙ্গন করতে গিয়ে স্বদেশ-বিস্মৃত হননি শিল্পী। মনে হয় সব বিশৃঙ্খলা ও কোলাহল শান্ত করে নিজের স্বপ্নের স্পেসই ছিল তাঁর কাঙিক্ষত। শিল্প তো সব মতবাদী মানুষের জন্যই বাঁচার উপায়। আনিস উডকাঠের বিচিত্র জাল-জালিকায় সুন্দর আবাস খুঁজে পেয়েছেন।

 

 

Moinuddin Khaled

Enter your keyword