শেখ আফজাল
আফজালের আঁকা বিস্ময়-বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনে দর্শকদের ক্ষণকালের জন্য হলেও থমকে যেতে হয়। মানবশিশু যে বিমুগ্ধতা নিয়ে এই পৃথিবীর বৈচিত্র্যকে অবলোকন করে ছবির এসব বালকের দৃষ্টিতেও লেগে আছে তার ঘন আস্তর। ক্যানভাসে নির্দোষ-নিষ্পাপ এসব শিশুর সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে নানারূপ অজৈব ফর্ম- শুকনো পাতা, মরা প্রজাপতি, পাথরের আস্ত কিংবা খণ্ড টুকরো, যন্ত্র কিংবা যন্ত্রাংশ। কড়ি ও কোমলের এই বৈপরীত্য থেকে শিল্পীর মনোগহনের একটা পরিচয় অন্তত পাওয়া যায়। সাম্প্রতিককালের অভিরুচিতে পরিমার্জিত ও পরিশীলিত সুন্দরের সঙ্গে অমার্জিত সুন্দরের যে সংমিশ্রণ তারও কিছু সূক্ষ্ম আভাস হয়ত এর মধ্যে মেলে।
শেখ আফজাল উচ্চশিক্ষার্থে কিছুকাল জাপানে ছিলেন। জাপানি জীবন ও ভাবধারায় প্রভাবিত হওয়া তার জন্য অস্বাভাবিক নয়। এখানে স্মরণীয়, হিরোশিমার পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ সংক্রান্ত সেই বিখ্যাত ফটোগ্রাফের কথা, যাতে ধারণ করা হয়েছে একটি বিধ্বস্ত অট্টালিকার পটভূমিতে এক বালকের ছবি, একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা জাপানি মানসকে শুধু তাড়িত করে, যা তাদের সৃষ্টিশীলতার প্রেরণাও। তারা সেই ধ্বংসলীলার চিহ্ন মুছে ফেলেনি, কিন্তু তারই ওপর গড়ে তুলেছে জীবনের ঐশ্বর্য । কোমল ও কঠোরের এই মিলনসাধন, ধ্বংসের বিস্তারের মধ্যে জীবনের উত্তাপ সন্ধান-সবকিছুই হয়ত শিল্পীর অবচেতন মনের গহন গভীরে কোনো বোধের সঞ্চার করে, কোনো একটি মোটিফকে অবলম্বন করে কোনোকিছুর প্রকাশ ঘটাতে চায়।
শেখ আফজাল ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তারপর গিয়েছেন জাপানে। স্থায়ীভাবে এখন ঢাকায় অবস্থান করলেও নিজ গ্রাম ও আধুনিক নগর সভ্যতার পীঠস্থান এ দুয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। আধুনিক নগরজীবনের সকল সুযোগ-সুবিধার মধ্যে অনবরত বসবাস করেও এই শিল্পী গ্রামজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হননি মোটেই। জন্মভূমির সঙ্গে এই যে সংলগ্নতা, ফেলে-আসা জীবনের দিকে ফিরে ফিরে এই যে তাকানো, এর মধ্যে আত্মআবিষ্কারের প্রয়াস হয়ত আছে, নিজ বালক বয়সের প্রতি দৃষ্টি ফেরানোরও এ এক অন্তর্তাগিদ। নগর ও গ্রামজীবন এই উভয়ের মধ্যে নিজের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করার এই মানসিকতা তার ছবিকেও, বলা যায়, এক প্রকার বিশিষ্টতা দিয়েছে।
রিয়ালিস্টিক ধারার শিল্পী শেখ আফজালের ছবিতে অধিকাংশ অবয়বই তার অভঙ্গ রূপ নিয়ে উপস্থিত। অথচ একই সঙ্গে তিনি শিল্পের আধুনিক টেকনিকগুলোকেও ব্যবহার করেন সচেতনভাবে। ছবির তল নির্মাণ কৌশলে যেমন রয়েছে আধুনিক টেকনিকের স্বায়ত্তশাসিত প্রয়োগ তেমনি তার ওপরে বিবিধ উপায়ে সৃষ্টি করেন বিচিত্র সব টেক্সচার। কখনও বর্ণলেপনের কৌশলে, কখনও রঙের ওপরে রোলার, ছুরি কিংবা চাকু ব্যবহার করে, ব্রাশের শক্ত বাঁট দিয়ে কিংবা কাপড় দিয়ে ঘষে তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন নানা টেক্সচার যা দর্শকমনে বহুমাত্রিক আবেদন সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়ায় তার ছবিতে এমন কিছু আকার বা ফর্ম সৃষ্টি হয় যাকে তিনি সুষ্ঠু কম্পোজিশনের স্বার্থে আবার সুস্পষ্ট করে তোলেন। ছবির এই পটভূমিকে ভিত্তি করেই তিনি অবয়বকে সাজান। আর এভাবে শিল্পের এক স্বতন্ত্র নিজস্ব ভাষা সৃষ্টিতে তিনি সক্ষম হয়ে ওঠেন।
প্রতিকৃতি-আঁকিয়ে হিসেবে শেখ আফজাল বাংলাদেশে স্বনামধন্য। ছাত্রজীবন থেকেই এ কাজে তিনি অ্যাকাডেমিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। এই দক্ষতা তার রিয়ালিস্টিক কাজের প্রেরণারও অন্যতম উৎসমূল। তবে ঢাকাতে øাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর অবয়বধর্মী কাজ করবেন নাকি বিমূর্ত শিল্পচর্চা করবেন এ নিয়ে শিল্পী কিছুকাল দ্বন্দ্বে ভোগেন। ওই সময়ে কিছু আধা বিমূর্ত ছবিও তিনি আঁকেন। জাপানে যাওয়ার পরেও কিছুকাল এই দ্বন্দ্ব তার মধ্যে ছিল। কিন্তু সুকুবা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষক অধ্যাপক ইয়ামামুতো ফুমিহিকো তাকে আধুনিক টেকনিক সহযোগে অবয়বধর্মী ছবি আঁকতে অনুপ্রাণিত করে এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটান। ওই সময়ে জাপানে অনুষ্ঠিত কিছু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর প্রদর্শনীও তাকে রিয়ালিস্টিক ধারায় স্থিত হতে সাহায্য করে। আন্তর্জাতিক শিল্প-অঙ্গনে গত শতাব্দীর সত্তর ও আশির দশকে ফটোরিয়ালিজমের যে জয়জয়কার ছিল তারই পথ ধরে রিয়ালিস্টিক ছবির একটি ধারা নতুন করে পরিপুষ্ট হয়েছে। এই ধারারই অংশ হিসেবে শেখ আফজালের ছবিতে আমরা অবয়বের যে অভঙ্গ রূপ পাই তা শিল্পকলার ইতিহাসের ক্লাসিক যুগকেই অনেকটা স্মরণ করিয়ে দেয়। ধ্র“পদী ছবির অনুষঙ্গ হিসেবেই তার ক্যানভাসে ঈষৎ পিঙ্গল বর্ণের সমাহার লক্ষণীয়। ধ্র“পদী বৈশিষ্ট্য তার ছবিতে এক ধরনের মনোক্রম্যাটিক আবেদনও সৃষ্টি করেছে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, শেখ আফজাল ধ্র“পদী ছবির ভাষার সঙ্গে আধুনিক টেকনিকের সমন্বয় সাধন করেছেন। এভাবেই কিছু কিছু অবয়বের পরিচিত আদল অক্ষুণœ রেখেও তিনি ফটোরিয়ালিস্টদের থেকে ভিন্নতা অর্জন করেছেন। তার ক্যানভাসের একটি ক্ষুদ্র অংশই কেবল ফটোরিয়ালিজমের বৈশিষ্ট্যচিহ্নিত।
কিছু কিছু মুখ বা অবয়বের অভঙ্গ রূপ অঙ্কিত হওয়ার পাশাপাশি শিল্পীর ক্যানভাসে কখনও কখনও সেই একই মুখ আবার অস্পষ্টতা অর্জন করে, ধূসরতায় আচ্ছন্ন হয় এবং ছবির পটভূমি ও টেক্সচার মিলে একটি অপরিচিত পরিবেশ রচনা করে। এর মধ্য দিয়ে ছবির জমিনে রহস্যময়তার একটা ঘন আবরণও সৃষ্টি হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, শেখ আফজালের নিসর্গ দৃশ্যমূলক ছবির পটভূমিতে যে গভীরতা বা সুদূরতা থাকে তেলরং চিত্রে তা অনুপস্থিত। তেলরং চিত্রে পটভূমির গভীরতা মুছে দিয়ে শিল্পী দর্শকের জন্য এক রহস্য রেখে দেন, দর্শককে কল্পনার সুযোগ করে দেন। রহস্যময়তার পাশাপাশি তার ছবির আরেকটি বৈশিষ্ট্য নাটকীয়তা। অবয়ব উপস্থাপনের কৌশলে যেমন এই নাটকীয়তা আছে তেমনি তা আছে আলো-ছায়ার বিন্যাসে। ফলে তার পুরো ক্যানভাস জুড়ে মঞ্চসদৃশ এক নাটকীয়তার পরিবেশ রচিত হয়। এই রহস্যময়তা ও নাটকীয়তার সম্মিলিত আবেদন তার ছবিকে স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত করেছে।
শেখ আফজালের ছবি অবয়বধর্মী হলেও তা কোনো আখ্যান সৃষ্টি করে না। ব্যতিক্রম হয়ত আছে কিন্তু তা একেবারে উল্লেখযোগ্য নয়। শিল্পী সচেতনভাবেই কাহিনীর সূত্রকে বিনষ্ট করেন। এই বিচ্ছিন্নতার সূত্র নিহিত অবয়বের বিন্যাসে। কিংবা শিল্পী এমন কিছু অসংলগ্ন মোটিফের অবতারণা করেন যা পুরো বিষয়টিকে সূত্রবদ্ধ করে একটি গল্প গড়ে তোলার পরিবর্তে পরস্পরের অসংযোগকে কেবল বাড়িয়ে দেয়। তবে তার ছবিতে অবয়বের ভঙ্গিগত উপস্থাপনের মধ্যে একধরনের ন্যারেশন হয়ত আছে। আধুনিক চিত্রকলায় অবয়বকে কেবল দ্বিমাত্রিকভাবে নয় ষড়মাত্রিকভাবে দেখার যে প্রয়াস সৃষ্টি হয়েছে বিশ শতকের সূচনালগ্নে সে কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। শেখ আফজালের ক্যানভাসে অবয়বগুলো যে নানা ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয় তাতে বিচিত্র মাত্রায় অনুধাবনের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় হয়ত পাওয়া যাবে। তাছাড়া টেক্সচার সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এক ধরনের ন্যারেশন আছে। কত ধরনের ভিন্নতর আবেদনবাহী টেক্সচার সৃষ্টি করা যায় তার এক সচেতন প্রয়াসে শিল্পী উজ্জীবিত। এ ক্ষেত্রে শিল্পীর সাফল্য ন্যারেশন সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে খ্যাতিমান শিল্পীরা রিয়ালিস্টিক ধারার অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও ষাটের দশকে বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পচর্চার জাগরণে ওই ধারার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ফলে এই বাধা অনেকটা কেটে গেলে পরবর্তীকালে এই দুই ধারা কখনও সমান্তরালভাবে অগ্রসর হয়, কখনও দুয়ের মধ্যে সন্ধি স্থাাপিত হয়, কখনও রিয়ালিস্টিক ধারার শিল্পীরা বিমূর্ততার সঙ্গে আপস করেন এবং তাতে বিশুদ্ধ রিয়ালিস্ট ধারা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও যারা বিশুদ্ধ রিয়ালিস্ট ধারাকে অবলম্বন করে একে বিকশিত করে তুলছেন শেখ আফজাল তাদের মধ্যে অন্যতম। বাস্তববাদী চিত্র অঙ্কনের মধ্যেও যে কত সম্ভাবনা আছে, আধুনিক টেকনিক সহযোগে উপস্থাপনের মাধ্যমে এ জাতীয় ছবিকেও যে নিজস্ব ভাষায় স্বতন্ত্রভাবে দাঁড় করানো যায় শেখ আফজাল তা দেখিয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি ও সাফল্য লাভ করেছেন।
সৈয়দ আজিজুল হক
আগস্ট ২০০১