বিমূর্ত কাব্যময়তার মগ্ন শিল্পী টোকন

শিল্পী এমডি টোকন তার শিল্পচর্চায় রেখে চলেছেন নিরন্তর বিমূর্ত স্বপ্নমঞ্জরির প্রকাশ। স্পেস ও রঙের বিন্যাস হয়ে ওঠে তার ক্যানভাস কাব্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। দেশের গ-ি ছাপিয়ে বাংলাদেশের এই শিল্পী মার্কিন মুলুকে হয়ে উঠেছেন শিল্পরসিক, সমালোচকদের একান্ত প্রিয়। নন্দিতশিল্পী এমডি টোকনের অহর্নিশ ছুটে চলা শিল্পযাত্রার পরম ভাবনা ও ঐকান্তিক কথা উঠে এসেছে চারবেলা চারদিক-এর জন্যে রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনীর সাক্ষাৎকারে।

আপনি তো অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমের শিল্পী। ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন সুখ্যাতি। জানতে চাইছি আপনার শুরুর কথা, শৈশবের কথা।
আসলে আমার বেড়ে ওঠা বা শৈশবটাই কেটেছে ল্যান্ডস্কেপের মতো সুচিত্রিত গ্রাম ঝিনাইদহের রাজনগরে। কালী নদীর তীরেই কেটেছে দুরন্ত শৈশব। বাবা তোজাম্মেল জোয়ার্দার এবং মা রোমেনা খাতুনের সংসার টইটম্বুর ছিল ৬ ভাই ও ২ বোনের হৈ-হল্লায়। অনেক ঐশ্বর্য বা জৌলুস ছিল না জীবনযাপনে। কিন্তু এক অনাবিল আন্তরিকতা, শেয়ারিং ও আনন্দে ভরপুর ছিল বাড়িটি। টিনের চালার মাটির ঘর, পরতে পরতে মাটির স্তর, দেয়াল-জানালা ভেদ করে ঝুম বৃষ্টি দেখা, মাটির সোঁদা গন্ধ, আম কুড়ানো, চারপাশের প্রকৃতি-পল্লবকে খুব কাছে পাওয়া, মাটির কলস থেকে খেজুরের রস পেড়ে খাওয়াÑ এসবের অন্তর্লীনেই হয়তো লুকিয়ে ছিল শিল্পের অমিত স্বপ্নমঞ্জরি। বড় ভাই লিখতেন ‘রাখাল রাহা’ নামে। বাড়িতে ছিল এক মুক্ত ভাবনার পরিবেশ। তাই কোনোভাবেই ছবি আঁকাটা বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়নি। মায়ের রান্না করা, নকশি বুননে শুচিশিল্প কখন যেন গভীর বোধে শিল্পের সঞ্চারী হয়ে উঠেছিল। একটু যেন পাগলের মতোই খেপাটে ছিলাম গান শোনার বিষয়ে। রবীন্দ্রনাথ, লালন, ডিএল রায়, অতুল প্রসাদ, অখিল বন্ধু ঘোষ, সাগর সেন, এলটন জন, বব ডিলান আমার অস্তিত্বে স্থান করে নিয়েছিলেন। মনোজাগতিক বোধের স্তরটিই কিন্তু শিল্পের আত্মা। শিল্পী টেকনিক্যাল দিকটি যা-ই চর্চা করুক, শিক্ষা গ্রহণ করুক; কিন্তু তার প্রকাশ ঘটে মনোজাগতিক স্তরকে ঘিরে। ছবি আঁকার শুরুটা বলতে গেলে ওই নিবিড়ভাবে প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা, প্রকৃতির সঙ্গে ভালোবাসার গভীর বোধ থেকেই জন্মেছিল। পরবর্তী সময়ে ঢাকা চারুকলায় ভর্তি হলাম। শিল্পকে ভালো না বাসলে শিল্পের মধ্যে, চর্চার মধ্যে থাকা যায় না। এটা এক অদ্ভুত আধ্যাত্মবাদ, যা কেবল শিল্পীরাই অনুভব করতে পারেন। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে, শিল্পে জাগতিক শরীর দৃশ্যমান; কিন্তু এর মূল অস্তিত্ব কেবল অনুভবে। টোটালি স্পিরিচুয়াল অ্যাটাচমেন্ট।
২০০১ সালে দেশ ছেড়ে আমেরিকাবাসী হয়েছিলেন। এরপর সেখানে গিয়ে শিল্পী হিসেবে স্বনামধন্য একটি জায়গা তৈরি করলেন। অনেক নামকরা শিল্পীর তত্ত্বাবধানে কাজ করেছিলেন। জার্নিটা কি শেয়ার করবেন?
আমি ডিভি পেয়ে চলে গিয়েছিলাম। এটি সত্যি, বিষয়টি খুব সহজসাধ্য ছিল না। বিশেষ করে শিল্পী হিসেবে একটি অবস্থান তৈরি করা। আমেরিকায় সবাইকেই কাজ করতে হয়। তবে আমার লক্ষ্য ছিল শিল্পচর্চা। আমি পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেছি। আমি সেখানকার খ্যাতনামা এক্সপ্রেশনিস্ট পেইন্টারদের তত্ত্বাবধানে কাজ করেছি। আমার শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি রনি ল্যান্ডফিল্ড, ল্যারি পুনস, ম্যারিনো ডেল রোজারিও প্রমুখকেÑ যা আমার শিল্পী জীবনকে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করেছে। আমার দেশ থেকে আমি যা পেয়েছি, শিখেছি তার সঙ্গে আমেরিকার স্ট্রাগল, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা আমাকে শিল্পের পরমাত্মা দিয়েছে, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অলীক শক্তি দিয়েছে। আমার বোধে, অনুভবে আমার দেশকে আমি আরো নিবিড়ভাবে পেয়েছি।

ইতোমধ্যেই আপনি বেশকিছু আমেরিকান সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছেন। রিচার্ড লিলিস মেমোরিয়াল স্কলারশিপ, রেড ডট বেস্ট অ্যাওয়ার্ড, স্পুৎনিক গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ডসহ এমন অনেক অর্জন আপনার। অজস্র একক ও দলীয় প্রদর্শনী ছাড়াও আপনার ছবির সম্মানিত সংগ্রাহক হয়েছে মিউজিয়াম, গ্যালারি ও শিল্পরসিকরা। এই খ্যাতিকে আপনি কীভাবে দেখেন বা এই সাফল্যগাথার কী প্রভাব আপনার ওপর আছে?
আসলে যে কোনো শিল্পীর জন্যেই এ ধরনের অপরচুনিটি ইন্সপিরিশনাল স্পিরিট দেয়, যা শিল্পীকে এগিয়ে দেয়, সচল রাখে আর্ট জার্নি। নিঃসন্দেহে আমার জন্যে দায়িত্ববোধকে খুব দৃঢ় করে, প্রত্যয়ী করে তোলে। সে সঙ্গে আমাকে খুব আনন্দ দেয় আমার নামের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ’ নামক দেশটি জড়িয়ে থাকে। দেশের এই সম্মান ব্যক্তি সম্মানের অনেক ঊর্ধ্বে, অপার্থিব! তবে শিল্পীর আত্মা পিপাসার্ত। কোনো শিল্পীই এই পিপাসা থেকে বের হতে পারেন না। তৃষ্ণা আছে বলেই শিল্পী সৃষ্টি করে যেতে পারেন।

আপনার চিত্রকর্মের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে ‘স্পেস’ ও কালার। সে সঙ্গে ধ্যানমগ্ন নিমগ্নতা। এ সম্পর্কে কী বলবেন? কারইবা প্রভাব আপনার ওপর?
এটি সত্যিই, সব শিল্পীই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত ও উৎসারিত হন। কিন্তু শিল্পী তখনই মুক্তিলাভ করেন যখন তিনি নিজেকে খুঁজে পান। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, আমার প্রেরণা জ্যাকসন পোলক ও উইলিয়াম ডি কনিং। একজন শিল্পীর স্বকীয় স্বাধীনতা বোধের প্রেরণা আমি তাদের কাজ থেকে পেয়েছি। আমার ক্যানভাসের স্পেস হচ্ছে শান্তি ও সরলতার বারতা। পিস ও সিম্পলিসিটির মগ্নতায় আমি আচ্ছন্ন থাকি। আমার রঙের উৎসরণ হয় প্রকৃতি থেকে। সাদা-কালো, লাল-নীল আমার প্রিয় রঙ। স্পেস থেকে আমি অনেক গভীর ভাষা খুঁজে পাই।

শিল্পী শব্দটির সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক নিবিড়। ছবি নিয়ে আপনার আবেগ বা আঁকার সময় আপনার আবেগ কীভাবে উৎসারিত হয়?
একদম সত্যি! আবেগ না থাকলে সৃষ্টির উৎস নেই। প্রকৃতির, বনস্থলীর এক গভীর দৃশ্য অবলোকন আছে আমার বোধে। ছোট্ট ভালো লাগাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রেখা ও রঙের বর্ণসুষমায় তা যেন দৃষ্টির সীমানাকে অতিক্রম করে সিদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক রূপকথার মেজাজ তৈরি করে। ছবি আঁকার সময় আমি এক রোমাঞ্চকর আধ্যাত্মিক উন্মোচনে বিভোর থাকি, যা সাধনার মতো পবিত্র। ওইটুকু সময় জগতের কোনো কিছু আমাকে স্পর্শ করে না। তবে নিবিড়ভাবে ছড়িয়ে থাকে স্বদেশের মাটির ঘ্রাণ, ছোট ছোট স্মৃতিমালিকার প্রতিফলন হয়ে ওঠে শান্তির অন্বেষণের মর্মবাণী। হয়তো তা-ই হয়ে ওঠে শিল্পভাষায় পরমবোধ।
প্রেম ও শিল্পকে কীভাবে মেলাবেন?
আমি যতটা বেশি আমার সৃষ্টিকে ভালো বাসতে পারব ততটাই প্রেমিক হতো পারব। আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। স্ত্রীর নাম ‘সাবি’। চিত্রচর্চা আমার প্রথম প্রেম। এই সত্যকে আমার স্ত্রী খুব গভীরভাবে রেসপেক্ট করে। চিত্রচর্চা ছাড়া আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রেমবোধ ও ভালোবাসাবোধই পারে শিল্পীর ব্রাশকে সচল রাখতে। প্রেমই জীবনকে নান্দনিক মুক্তি দেয়। প্রেমই শিল্পীর সব সৃষ্টির প্রেরণা। এই বোধ দেশ-কালভেদে সব শিল্পীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। প্রকৃতি, শিল্প, মানুষ, সৃজন যেখানে একাকার হয়ে যায়।

সৃজনের সার্থকতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা দেবেন?
স্বকীয়তা ও শিল্পযাত্রার অভিযাত্রায় নিরন্তর সওয়ার হওয়াটা। পশ্চিমা চিত্রকলার প্রভাবের প্রতিলিপি আমরা যথেষ্ট দেখেছি। আমার প্রয়াসটা একটু ভিন্ন। যেখানে আমি নিজস্বতা, জন্মভূমির ঘ্রাণ ও শান্তির বারতাকে প্রাধান্য দেই। সেভাবেই নিরন্তর কাজ করে যাব। আমার দেশ, আমার জন্মভূমির মাটি-দুঃখ-বেদনা, বিপন্নতা- প্রশান্তিÑ এ সবই আমার ক্যানভাসে শ্রেষ্ঠ প্রতিভূ হয়ে বিবেচিত হবে।

শিল্পী টোকনকে নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম একান্তে কিছু কথা! আপনার হেয়ার স্টাইল, পোশাকের রঙে সাদা-কালোর ব্যবহার সম্পর্কে কী বলবেন?
চুলটা সামান্য একটু বড় রাখতে ভালোই লাগে। আমি খুবই সিম্পল থাকতে ভালোবাসি। সাদা ও কালো রঙের পোশাক পরতে খুব ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকেই আমি বাউলমনা। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা… মনে মনে…’। প্রকৃতির মধ্যে এখনো হারিয়ে যাই। সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আকাশ-কুসুম ভাবনায় ডুব দেই। ইচ্ছা করে ঝুম বৃষ্টি দেখার, নিরন্তর প্রহর, মায়ের হাতের ইলিশ মাছ-ভর্তা আর দেশি লাল চালের সেই ভাত, গাছ থেকে পেড়ে আনা খেজুরের রস। বিদেশে থাকলেও আমার ভেতর জেগে থাকে স্বদেশ, আমার বাংলাদেশ… নিরন্তর!

 

Source: Charbel Chardik

Enter your keyword