কীর্তিমানদের শিল্পকর্ম : ব্যতিক্রমী শিল্পসম্ভার

নজরুল ইসলাম
জয়নুল আবেদিন যখন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা শহরে এদেশের প্রথম চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেন তখন তিনি ছিলেন তরুণ এক শিল্পী, খ্যাতিমান অবশ্যই, তবে তাঁর দৃষ্টি ছিল সুদূর। শিল্পকলাকে এদেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলাবেন তিনি, অথবা বলা যায় জীবন মেলাবেন শিল্পকলার সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের আগে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে এবং মুক্তি অর্জনের পরে, সব সময়েই এদেশের অধিকাংশ চারুশিল্পী জীবনঘনিষ্ঠ থেকেছেন, দেশ অর্থাৎ দেশের মানুষ, মাটি, জল, নিসর্গ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য-সম্পৃক্ত থেকেছেন। এ কারণে চারুকলা সমৃদ্ধ হয়েছে। নানাভাবে বিস্তৃত হয়েছে। শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা বেড়েছে, সাধারণের কাছেও শিল্প ও শিল্পীর সমাদর বেড়েছে। পাশাপাশি আধুনিক চারুশিল্পের সমঝদার ও সংগ্রাহক গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে।

এদেশে চারুশিল্প সংগ্রহের একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। শিল্পাচার্য জীবিতাবস্থায় এ বিষয় সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করতে পারলেও এর সম্ভাব্য বিস্তার হয়তো পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি। তাঁর ও তাঁর সমকালীনদের শিল্পকর্ম বাজার পেতে মাত্র শুরু করেছিল, যদিও বিদেশিরাই তখন প্রধান ক্রেতা। ১৯৭৬ সালে তিনি যখন মৃত্যুবরণ করেন তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি খুবই দুর্বল। আর অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে সে কথা অজানা নয়। আশির দশক থেকে আমাদের অর্থনীতি ক্রমশ কিছুটা চাঙা হতে থাকে, এবং তা মূলত দুটো খাতকে নির্ভর করে। এক, রপ্তানি পোশাকশিল্পের বিকাশ এবং দুই, মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি। দুটোই বিশ্বায়নের ফলশ্রুতি। এছাড়া অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও বিকাশ ঘটেছে। দেশে উচ্চশিক্ষা ও বিনোদনের চাহিদা বেড়েছে। নতুন একটি ধনিক শ্রেণি গড়ে উঠেছে, এ শ্রেণির কিছু মানুষ আবার ধনীর পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। উচ্চ-মধ্যবিত্তের আকারও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। সব মিলিয়ে সুকুমার শিল্প, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার (ক্রিকেট) জনপ্রিয়তা বেড়েছে।

চারুশিল্পের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, দেশেই এর আন্তর্জাতিক মঞ্চ প্রতিষ্ঠা, উদাহরণ বাংলাদেশ শিল্পকলা আয়োজিত দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশের চারুশিল্পীদের প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ (ইদানীং ভেনিস বিয়েনালে প্রতিনিধিত্ব করা), আন্তর্জাতিক আর্ট ফোরামে (আর্ট এশিয়া সামিট) অংশগ্রহণ ইত্যাদি এই অগ্রগতির দৃষ্টান্ত। শিল্পকলা বিষয়ক লেখালেখি ও প্রকাশনাও ইদানীং আন্তর্জাতিক আঙ্গিক পাচ্ছে। এ সবকিছুর পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে শিল্পকলা নিদর্শন সংগ্রহের বিষয়টি এবং সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ভূমিকা। প্রতিষ্ঠান হিসেবে সরকারি সংস্থা ব্যাংক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপূরক হয়েছে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান (যেমন বেঙ্গল ফাউন্ডেশন)। তবে বাংলাদেশের চারুশিল্পের অন্যতম প্রশংসনীয় অগ্রগতি হিসেবে আমরা উল্লেখ করতে পারি একেবারেই ব্যক্তি সংগ্রাহকের কথা। এঁদের মধ্যে দু-একজন ইতোমধ্যে রীতিমতো পেশাদার সংগ্রাহক বা আর্ট কালেকটরের মর্যাদা অর্জন করেছেন, অনেকেই অবশ্য নেহাতই শৌখিন সংগ্রাহক।

নাসির আলী মামুনকে একজন শৌখিন শিল্প-সংগ্রাহক বললে খুব ভুল করা হবে না বা তাঁকে অসম্মানও করা হবে না। তিনি অনেকটা একজন অটোগ্রাফ-সংগ্রাহক ও ডাকটিকিট বা স্যুভেনির সংগ্রাহকের সংমিশ্রিত সত্তার সংগ্রাহক। একেবারেই ভিন্ন চরিত্রের সংগ্রাহক। তাঁর সংগ্রহে যেসব মানুষের শিল্পকর্ম, তাঁদের অধিকাংশই খ্যাতিমান শিল্পী, অথবা অনেকেই মোটেও অঙ্কনশিল্পী নন। তবে তাঁরা সবাই অবশ্যই খুবই কীর্তিমান, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এমনও হয়েছে যে, মামুনের অনুরোধেই এঁরা প্রথমবারের মতো একটি ছবি এঁকেছেন।

নাসির আলী মামুন বাংলাদেশে অত্যন্ত সুপরিচিত এক মানুষ। সামনের জুলাই মাসে ৬১ হবেন, কিন্তু মুখখানা একেবারেই তরুণ, এক গাল বিনয়ী হাসি তাঁর নিত্যসঙ্গী। মামুন আলোকচিত্রশিল্পী (ফটোগ্রাফার)। মূলত মানুষের মুখ তাঁর ক্যামেরার বিষয়, সাধারণ মানুষের মুখ এবং কীর্তিমানদের মুখ। কীর্তিমানদের প্রতিকৃতির জন্য মামুনের বিশেষ সুখ্যাতি। উদ্ভিদবিজ্ঞানী ফটোগ্রাফার ড. নওয়াজেশ আহমদের (১৯৩৪-২০১১) ক্যামেরায় আমরা পেয়েছিলাম নজরুল, জয়নুল ও কামরুলের মুখ। নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায় একের পর এক আপন ব্যক্তিত্বে স্থির হয়েছেন কবি জসীমউদ্দীন (১৯০৩-৭৬) থেকে শুরু করে বাংলাদেশ, ভারত তথা বিশ্বের বহু কিংবদন্তি মানুষ, কীর্তিমান যাঁরা নানা ক্ষেত্রে। জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, মোহাম্মদ কিবরিয়াসহ বাংলাদেশের অনেক শিল্পী। পরিতোষ সেন, কে. জি. সুব্রহ্মণ্যন্ থেকে শুরু করে বহু প্রখ্যাত ভারতীয় শিল্পী, শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের নানা বয়সের প্রতিভাধর মানুষ। উপমহাদেশ তথা বিশ্বের বহু মহান ব্যক্তির মুখ মামুনের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, মাদার তেরেসা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অমর্ত্য সেন, মুহাম্মদ ইউনূস, গুন্টার গ্রাস, অ্যালেন গিনসবার্গ আরো অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়।

মামুনের পোর্ট্রটে ফটোগ্রাফির বৈশিষ্ট্য তাঁর নির্বাচিত ব্যক্তির ভেতরের মানুষটিকে ফুটিয়ে তোলা। একটি মাত্র ছবিতে একজন প্রতিভাধর মানুষের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ অত্যন্ত কঠিন কাজ। এজন্য অবশ্যই বিষয়-ব্যক্তিকে মামুন নানাভাবে অনুসরণ করেন, পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁর অসংখ্য ছবি তোলেন, শেষে এক বা একাধিক ছবি চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করেন। বিষয়-ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘনিষ্ঠ হয়। মামুন তাঁর ক্যারিয়ারের প্রায় শুরু থেকেই পোর্ট্রটে করার পাশাপাশি তাঁর বিষয়-ব্যক্তিত্বের হাতে কাগজ ও কলম বা তুলি ধরিয়ে দিতেন তাঁর জন্য একটি ছবি এঁকে দেওয়ার জন্য। যিনি নিজে চারুশিল্পী, তাঁর জন্য কাজটি কঠিন নয়। কিন্তু যিনি সারাজীবন শুধু কবিতাই লিখেছেন, শুধু অভিনয় করেছেন বা প্রবন্ধ লিখেছেন, আগে কখনো ছবি আঁকেননি তাঁর কাছে কাজটি মোটেও সহজ নয়। কিন্তু মামুনের তাগিদে তিনিও এঁকেছেন, একটি নারীমুখ অথবা একটি সূর্যমুখী ফুল, এমনকি আত্মপ্রতিকৃতি। তাঁদের আঁকা ছবিতে নিজের নাম স্বাক্ষর করেছেন ও আঁকার তারিখ দিয়েছেন। এইসব ছবি নাসির আলী মামুনের মূল্যবান সংগ্রহ নির্মাণ করেছে। অবশ্য কীর্তিমানদের উপহার চিত্রমালা সংগ্রহের পাশাপাশি মামুন তাঁর সামর্থ্যরে মধ্যে হলে ছবি কিনেছেনও।

মামুন তাঁর তোলা আলোকচিত্রের একটি নিজস্ব সংগ্রহশালা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছেন, ঢাকার অদূরে সাভারে এক খ- জমিও ক্রয় করেছেন, সেখানে তাঁর স্বপ্নের সংগ্রহশালার জন্য ভবন নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছেন। ভবনের নির্মাণব্যয় নির্বাহের জন্য তাঁর অতি প্রিয় চিত্রসংগ্রহ থেকে নির্ধারিত কিছু ছবি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছেন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তাঁর এই উদ্যোগে সমর্থন দিয়েছে। বেঙ্গল শিল্পালয়ে নাসিরের সংগ্রহ থেকে বাছাই করা ৩৭ জন শিল্পীর কাজ দিয়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ‘তার আলো তার ছায়া’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। শিল্পাচার্য থেকে শুরু করে শিশির ভট্টাচার্য,পরিতোষ সেন থেকে গৌতম ঘোষ প্রমুখ কীর্তিমানের চিত্রকর্ম তাতে প্রদর্শিত ও বিক্রি হয়।

মামুনের সংগ্রহশালা নির্মাণের অর্থ সংকুলানের জন্য এবার তিনি সংগ্রহের দ্বিতীয় প্রদর্শনী করছেন, ১৪ জুন থেকে ৫ জুলাই, বেঙ্গল শিল্পালয়েই। প্রদর্শনীতে কীর্তিমানদের সংখ্যা এবার ৫৪। এতে বাংলাদেশের কাজী আবুল কাশেম, কামরুল হাসান, এস এম সুলতান, শফিকুল আমিন, আমিনুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাক (এঁরা সবাই প্রয়াত), মুস্তাফা মনোয়ার, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, মনিরুল ইসলাম, শহীদ কবির, শাহাবুদ্দিন থেকে শুরু করে তরুণ দিলারা বেগম জলি, রনি আহমদ প্রমুখের নানা আঙ্গিকের ছোট-বড় কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে।

ভারতের শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন শুভাপ্রসন্ন, শক্তি বর্মণ, পূর্ণেন্দু পত্রী, ধীরাজ চৌধুরী, লালু প্রসাদ সাউ, গণেশ হালুই, ঈশা মোহম্মদ, যোগেন চৌধুরী, সুনীল দাস, সুহাশ রায়, ওয়াসিম কাপুর প্রমুখ।

তাৎক্ষণিক অনুরোধেও যেসব ছবি আঁকা হয়েছে, তাতেও শিল্পীদের নিজস্ব স্টাইল চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। মামুন অনেক শিল্পীকে রবীন্দ্রনাথকে আঁকার অনুরোধ করেছিলেন; তাঁরা প্রত্যেকেই যাঁর যাঁর ঢঙে কবিকে এঁকেছেন। বাংলাদেশের পটচিত্রী শম্ভু আচার্য ক্যানভাসে এঁকেছেন পট ও আধুনিকতার মিশ্রণ দিয়ে। ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, যিনি ভাস্কর একজন, রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন অ্যাক্রিলিকে। রাবীন্দ্রিক চিত্রাঙ্গিক অনেকটা। প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শন প্রয়াত শিল্পী আবদুর রাজ্জাকের ছাত্রকালীন সময়ে (১৯৫১) জলরঙে আঁকা তাঁর সতীর্থ বন্ধু রশীদ চৌধুরী। এস এম সুলতানের ড্রইং (১৯৮০) ‘কিষানী’ অন্য একটি মূল্যবান ছবি। কামরুল হাসানের একটি অনবদ্য ড্রইং প্রদর্শনীর মর্যাদা বাড়িয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ার, সৈয়দ জাহাঙ্গীর ও মনিরুল ইসলামের জলরং কাজগুলো অসাধারণ।

নাসির আলী মামুন অশিল্পী কীর্তিমানদের হাত থেকে বের করে এনেছেন মজার সব ড্রইং, কবি শামসুর রাহমানের নারীমুখ (২০০১), ধীমান অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এঁকেছেন নিষ্পাপ মুখ একখানা। কবি নির্মলেন্দু গুণ কিংবা লেখক হুমায়ূন আহমেদ একাধারে ভালো শিল্পীও। তাঁদের দিয়েও মামুন তাঁর নিজের ছবি আঁকিয়ে নিয়েছেন। মামুনের আন্তরিক আহ্বানে এরকম অনেকেই সাড়া দিয়েছেন। ভারতীয় শীর্ষ শিল্পী ও সাহিত্যিকের কাছ থেকেও মামুন ছবি পেয়েছেন। শুভাপ্রসন্ন, যোগেন চৌধুরী, লালু প্রসাদ কিংবা পূর্ণেন্দু পত্রীদের কাজের পাশাপাশি লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিংবা অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ড্রইং বেশ লাগে।

মামুন যেমন তাঁর ক্যামেরায় কীর্তিমানদের পোর্ট্রটে করেছেন, উল্টো তাঁদের অনেককে দিয়ে নিজের প্রতিকৃতি আঁকিয়ে নিয়েছেন। এবারের প্রদর্শনীতে সম্ভবত এসব ছবি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

বস্তুত মামুনের চিত্রকলার সংগ্রহ একটি অসাধারণ অর্জন। মূলত উপহারভিত্তিক তাঁর সংগ্রহ অথবা স্বল্পমূল্যে সংগৃহীত, তাঁর স্বপ্নের ফটোজিয়াম নির্মাণের জন্য এই সংগ্রহ থেকে কিছু শিল্পকর্মের মায়া তিনি ছাড়তে চাইছেন। কাজটি তাঁর জন্য খুব সহজ হচ্ছে না, এটি অবশ্যই বড় রকমের আত্মত্যাগ। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তাঁর এই ব্যতিক্রমী শিল্পসম্ভার তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর প্রস্তাবিত আলোকচিত্র সংগ্রহশালায় চিত্রশিল্পের স্থায়ী প্রদর্শনের ব্যবস্থাও নিশ্চয়ই তিনি রাখবেন। তখন ফটোজিয়াম একটি আদর্শ শিল্পকলা সংগ্রহশালার রূপ নেবে, এমন আশা করা যায়। নাসির আলী মামুনের স্বপ্ন সফল হোক।

Enter your keyword