কাজী গিয়াসের চিত্রকৃতি : ধ্যানমগ্নতায় পরি
দ্বিমাত্রিক পরিসরের কুশলী বিন্যাসই যদি হয় চিত্রপটের শিল্পিত প্রকাশ তাহলে কাজী গিয়াসের চিত্রকর্ম অভিনিবেশী দৃষ্টিপাত দাবি করতেই পারে। দীর্ঘদিন জাপান-প্রবাসী এ শিল্পীর কাজ একটি স্বতন্ত্র সংবেদনশীলতার এলাকা নির্মাণ করেছে যা আমাদের নির্বস্তুক শিল্প-ঘরানার বড়সড় রাজ্যপাটেও আলাদা করে নজর কাড়ে। চীন-জাপানের ঐতিহ্যিক সংস্কৃতিচর্চায় যে আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্নতার পরিশীলিত ব্যাপ্তি রয়েছে গিয়াসের দীর্ঘ চিত্র-সাধনায় তার প্রলম্বিত ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর চিত্রপট উপকরণের শুদ্ধতায়, নির্মাণের নির্জন একনিষ্ঠতায় ও উচ্চারণের নিম্নকণ্ঠ গাঢ়তায় এ কালের কোলাহলময় শিল্পজগৎ থেকে তফাতে দাঁড়ায়। তাঁর এবারের প্রদর্শনীটির শিরোনাম অ্যা পিলগ্রিমেজ ফর পিস, যার মধ্যেও শিল্পভাবনা ও মানস-গঠনের অনুরূপতা প্রকাশমান।
তাই বলে গিয়াসের চিত্রকর্ম কি কোনো অপার্থিবলোকের ইশারামণ্ডিত রূপকল্প কিংবা কোনো অধ্যাত্মলোকের অনুসন্ধান-প্রত্যাশী শিল্প-প্রয়াস? সম্ভবত নয়। বেঙ্গল গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া তাঁর পূর্ববর্তী দুটি প্রদর্শনীর শিরোনাম যথাক্রমে পিস অ্যান্ড হারমনি আর সেরিনেড অব রেইন, যাদের সঙ্গে বর্তমান শিরোনামের আত্মীয়তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। শিল্পকর্মকে প্রকৃতির শুদ্ধতা বা উদ্দেশ্যের মাহাত্ম্যের সাথে একীভূত করে নৈমিত্তিকতার গণ্ডি-অতিক্রমী উচ্চমার্গীয় কিছু হিসেবে জাহির করবার আমাদের আঞ্চলিক প্রবণতা থেকে গিয়াসও মুক্ত নন। আমরা বরং শিরোনামে চমকিত না হয়ে এ চিত্রীর শিল্প-প্রয়াসকে দ্বিমাত্রিক তলের শিল্পীত ও তাৎপর্যপূর্ণ বিন্যাস হিসেবে বিবেচনা করলেই বোধ হয় অধিকতর লাভবান হবো। এভাবে হয়তো এ সিরিজ চিত্রমালার গভীরতর কোনো পাঠ আবিষ্কার সম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
প্রদর্শিতব্য চিত্রমালায় শিল্পী বর্ণকে চিত্রপটের শূন্য জমিনে একইসঙ্গে নিজস্ব চারিত্র্যধর্মে চালিত হতে দিয়েছেন, আবার তুলির অনুশাসনে এনে তাৎপর্যপূর্ণ বিন্যাস হিসেবে নির্মাণের প্রক্রিয়ার আওতায়ও বেঁধেছেন। দুটি বিপরীত ক্রিয়ার দ্বান্দ্বিকতায় নয়, সহাবস্থানে নির্মিত হয়েছে সংবেদনশীল চিত্রভূমি। কাজী গিয়াস দীর্ঘকাল এ প্রক্রিয়ার নানান রকমফেরে তাঁর শিল্পসাধনায় সক্রিয় রয়েছেন যা দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় পরিশীলন ও উৎকর্ষের একটি স্তর অতিক্রম করে অন্যতর স্তরে উন্নীত হয়েছে। ষাট-সত্তরের দশকে আমাদের দেশে যাঁরা শিল্পসাধনায় যাত্রারম্ভ করেছেন নির্বস্তুকতার একটি বিপুল মোহ তাঁদের আবিষ্ট করেছিল, যে ঘোর এখনো পুরোপুরি কেটেছে এমনটি বলা যাবে না। গিয়াসের সূচনাও ছিল ওই উদ্দিষ্টেই, কিন্তু তিনি আমাদের অধিকাংশ বিমূর্ততাবাদীর মতো এর উপরিতল আলঙ্কারিকতার ঘেরাটোপের মধ্যে বন্দি হননি। সম্ভবত জাপানি সংস্কৃতিতে বিমূর্ততার সঙ্গে জীবনাচারের যে গভীর সংযোগ সেটি তাঁকে নির্বস্তুকতার অন্তর্নিহিত ধ্যানমগ্নতার নিহিতার্থের প্রতি আকর্ষিত করেছে। ফলে, প্রদর্শনীর শিরোনাম যেটিই হোক, কাজী গিয়াসের শিল্পকর্মে চিত্রতলের সমাহিত সৌকর্যের উদ্ভাসনই দর্শককে বিমোহিত কেও।
এটি ঠিক চিত্রভূমির চাক্ষুষ আকর্ষণই গিয়াসের মূল বিবেচনা। বর্ণ তাঁর চিত্রতল সংগঠনের মূল হাতিয়ার। বর্ণের স্বতঃচালিত প্রসারণ ও শোষণক্রিয়ায় সৃষ্ট পটভূমির বিক্ষত তলে শিল্পী গড়ে তোলেন অতি গভীর ও সূক্ষ্ম বুনট, আঁকিবুকি, ফোঁটা-ফুটকি আর ডৌলের সুচিন্তিত বিভাজনে গড়া ব্যঞ্জনাময় অবয়ব। দৃশ্যমানতা ও অদৃষ্ট-জগতের বিভাজনরেখায় এ দৃশ্যপটের অবস্থান, অস্ফুট ও অর্ধস্ফুট, অঙ্কুরোদ্যত ও বিলীয়মান এই দ্বিবিধ অবস্থানের মধ্যবর্তী পরিসরে অবস্থিত তাঁর জগৎ, এটি আমরা আগেই দেখেছি। এবারের চিত্রমালায় (২০০৮-০৯ সালে যেগুলি রচিত) নির্বস্তুক পটভূমিতে স্ফুটমান মানব-অবয়ব ও আরো কিছু দৃশ্যবস্তুর আভাস দেখা দিতে শুরু করেছে – এটি কাজী গিয়াসের কাজে নতুন সংযোজন। যদিও এ সব রূপের গড়ন একেবারে প্রাথমিক ধাঁচের, পাথুরে পাহাড়ের গায়ে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের রেখাচিত্রের সমগোত্রীয়, তবু এর মধ্য দিয়ে শিল্পীর নন্দনভাবনায় একটি উত্তরণের ইঙ্গিত প্রতীয়মান যার গুরুত্ব বিবেচনার দাবি রাখে।
কাজী গিয়াসের চিত্রমালা সর্ব অর্থে আধুনিক নন্দন-ধারণার উত্তম উদাহরণ, – সুসংবদ্ধ, সুচারু, পরিশীলিত ও দৃষ্টিনন্দন। তাঁর বর্ণ শান্ত ও নমিত, চিত্রতলে রেখা-গড়ন-বুনটের বিন্যাস সুসমন্বিত ও সাযুজ্যমণ্ডিত, দর্শকের মানসলোকে এ চিত্রের আবেদন সংবেদনশীল ও ব্যঞ্জনাময়। বাংলাদেশের দৃশকলা জগতে কাজী গিয়াসের চিত্রকর্ম তার সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত সৌন্দর্যে শিল্প-উৎকর্ষের একটি উচ্চ মান রচনা করেছে। তাঁর চিত্রকর্মের অবলোকন সর্বদাই একটি আনন্দময় অনুভূতি। বর্তমান প্রদর্শনীটিতে পাশাপাশি তাঁর মধ্যে পরিবর্তনের যে আভাসটুকু পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের বিশ্বাস, সেটি আরো প্লল্ল্ল্লবিত হয়ে ভিন্নতর একটি শিল্পলোকে দর্শককে আবাহন করবে যার মধ্যে সমকালের ক্ষত ও আর্তিও ভাষা পাবে। কাজী গিয়াসের মতো শক্তিমান শিল্পীর হাতে সেটি সম্ভব বলে তাঁর কাছে প্রত্যাশাটিও বড় মাপের।
Abul Mansur