‘শিল্পে নারীসত্তার দৃশ্য বাস্তবতা’ রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনী

শিল্পী দিলারা বেগম জলি! তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চায় মগ্ন! স্বনামধন্য এই শিল্পীর অসংখ্য দলীয় ও একক প্রদর্শনী প্রদর্শিত হয়েছে স্বদেশে এবং বিদেশে। সম্প্রতি বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস তার একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। সেই সূত্র ধরেই শিল্পী দিলারা বেগম জলি তার শিল্পচর্চা ও শিল্পভাবনার কথা মেলে ধরলেন চারবেলা চারদিক-এর পাঠকদের জন্যে!

প্রশ্ন : একটু যদি পেছনে যাই, কেমন ছিল আপনার স্বপ্ন দেখার দিন, শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প!
দিলারা বেগম জলি : আমার জন্ম ১৯৬০ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ৫ বোন ও ৩ ভাইয়ের এক বড় সংসার। বাবা ছিলেন রেলওয়েতে, মা শিক্ষকতা করতেন। আমাদের পৈতৃক বাড়ি খুলনায়। চট্টগ্রামে আমাদের বেড়ে ওঠা। মা খুব ভালো সেলাই করতেন। সে সময়ের সুনিপুণ সূচিশৈলী। বোনেরা গান করতেন, আমিও করতাম। বাড়িতে একই সঙ্গে সংস্কৃতিচর্চা ও পড়াশোনার পরিবেশ ছিল। সে সঙ্গে শৃঙ্খলাও। শিল্পী হবো এমন কল্পনায় বেড়ে উঠিনি। চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর শিল্পচর্চায় বিমোহিত ও নিমগ্ন হই। খুবই সুন্দর একটি কলেজটি, সে সঙ্গে শিল্পচর্চার এক অনন্ত জগৎ। তখনই প্রথম বোধকরি, ড্রইং বা পেইন্টিংয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করা যায়, শিল্পের অতলে গিয়ে প্রতিনিয়ত নতুনকে আবিষ্কার করা যায়, সত্যি বলতে কি জীবনের এক নন্দিত বোধের সুধা, সত্যের অমিত প্রকাশ।

প্রশ্ন : শিল্পের সঙ্গে আপনার পথচলা দীর্ঘসময়! মাধ্যমগত বৈচিত্র্য ও পরিবর্তন এসেছে আপনার কাজে। বিষয়বস্তুতে ‘নারীসত্তা’র দৈনন্দিন অস্তিত্ব, প্রতিবাদ, সঙ্কট, আকাক্সক্ষা, মানবিক প্রকাশের এক ধ্যানের সুষমা হয়ে ওঠে আপনার সৃষ্টি! এ বিষয়ে একটু বলবেন?

দিলারা বেগম জলি : খুবই সত্যি যে, আমার কাজে মাধ্যমগত বিবর্তন খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। ক্যানভাস থেকে প্রিন্ট, স্থাপনা, পারফর্মিং, ভাস্কর্য এবং ভিডিওচিত্র নির্মাণÑ এমন বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এসেছে আমার মাধ্যমগত প্রয়োগে। বিষয়ের প্রকাশে আমি সবসময় জেন্ডারকে প্রাধান্য দিয়েছি। সেজন্যেই আমার কাজে লালসালু, রোকেয়ার কথা, বিজ্ঞাপনে নারী, ক্যালেন্ডারে নারী, ‘বস’, কোরবানি, চাঁদের অমাবস্যা, তাহার পরে, ঘরে বাইরে, দিবা-রাত্রির কাব্য, নূরজাহান, তাজরিননামাÑ এমন বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। আমার ভীষণ প্রিয় একটি মাধ্যম ‘প্রিন্ট’। প্রিন্টমেকিংয়ের ওপর বিশেষ দুর্বলতা আছে; কিন্তু এ মাধ্যমে কাজ করার জন্যে অনুষঙ্গগুলো সবসময় হাতের কাছে সহজলভ্য হয়ে ওঠে না। তাই আমি ফিরে যাই ড্রইং, ভাস্কর্যে। পারফর্মিং আর্ট নিয়ে বেশ কিছুদিন কাজ করেছি। এটি একটি অন্যরকম অনুভূতি। আমি যা বলতে চাই, সেটা প্রকাশ করছি এক্সপ্রেশনে! আবার ইনস্টলেশন বা স্থাপনা নিয়ে কাজ করতে খুব ভালো লাগে। দৈনন্দিন জীবনে ‘নারীসত্তা’র যে বাস্তবতা, স্বপ্ন বাঁচার লড়াইÑ এসব আমাকে খুব স্পর্শ করে। শিল্পীসত্তার সঙ্গে মানবিকসত্তার এক যুগল সম্মিলন থাকে। সেই মেসেজগুলোই উঠে আসে আমার কাজে শিল্পের উৎস হয়ে।

প্রশ্ন : আপনার কাছে শিল্প কী? কোন শিল্পীর কাজ আপনাকে ভাবায় বা শিল্পভাষায় কি নারী শিল্পীদের কাজকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়Ñ সেটাইবা কেন?
দিলারা বেগম জলি : শিল্পের ফ্রেমবন্দি রূপ থেকে শিল্পের প্রকাশ ও ব্যাপ্তির দুয়ার আজ অবারিত। শিল্প কখনোই কুক্ষিগত সত্তা নয়। আমার কাছে শিল্প হলো জীবনের গল্প বলা, সত্যকে সঙ্গী করে চলা। তাই আমার কাজের প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় অকাট্য বাস্তবতা, নৈমিত্তিক নারীজীবনের উপাখ্যান। এক সময় ভ্যানগগ ভীষণ ভাবাত। ফ্রিদা কাহ্্লো, লুই বুর্জোয়া, জুডি শিকাগো, অর্পিতা সিং, নলিনী মালানিÑ এদের কাজ খুব ভাবায়। ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’কে আলাদা চোখে কখনো দেখিনি। কিন্তু নারীসত্তার এক বলিষ্ঠ ভাষা আমরা খুঁজে পাই নারী শিল্পীদের কাজে। যেখানে তারা নারীর বাস্তবতা, সংবেদনশীলতা বা মেসেজটা খুব দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে। বাংলাদেশের নারী শিল্পীদের কাজে সেই দৃঢ়তা ও প্রকাশের স্বাধীনতাবোধ খুবই তীব্র ও বলিষ্ঠ। শিল্প মনস্তাত্ত্বিকতায় নারীর অস্তিত্ববোধ, নারীর বাস্তবতা, নারী জীবনের ব্যাকরণের এক সমীকরণের জমি তৈরি করে, সেজন্যেই হয়তো নারীদের শিল্প প্রকাশের ভাষাটা ব্যতিক্রম। আমি ‘ভ্রুণ’ নিয়ে কাজ করেছি। নারীর শরীরের দুটি পাওয়ারফুল সত্তা হলো জরায়ু ও স্তন। একই সঙ্গে এটি নারীর পাওয়ার ও ভিকটিম হওয়ার কারণ!
এই পাওয়ারফুল অরগান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, কোনো প্রদর্শনীতে একটু অনুসন্ধিৎসু উৎসুক দৃষ্টিপাত। এর কারণ হলো, নারীর স্তন বা জরায়ু নিয়ে কাজগুলোকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়। অর্থাৎ নারীদেহ নিয়ে কাজ করলে একটু সংবেদনশীল বা ভোগ্য উপকরণের মতো বিষয়টি দেখা হয়। কিন্তু আমার বা আরো নারী শিল্পীর মেসেজটা কিন্তু অন্য। প্রতিনিয়তই নারীসত্তাকে বিপন্নতা, সৃজনশীলতা, দহন, স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেই গল্পকথাগুলোই হয়তো তাদের কাজের এক নিজস্ব ভাষা রচনা করে।

প্রশ্ন : আপনি আরেকজন নন্দিতশিল্পী ঢালী আল মামুনের জীবনসঙ্গী। শিল্পী হিসেবে দু’জন শিল্পীর শেয়ারিং বা একে অন্যের কাজের প্রতি কতটা সমন্বয় বা প্রেরণা পান সে বিষয়ে একটু জানতে চাই!
দিলারা বেগম জলি : আমার সম্পর্কের সবচেয়ে মূল্যবান সূত্র হলো শিল্প। আমি তো প্রায়ই মগ্ন হয়ে যাই। এমনই একদিন দুপুরে রান্নার কথা মনেই নেই। মামুন দুপুরে এসে খেতে চাইল। আমি বললাম, হায় আমার রান্নার কথা মনেই নেই। মামুন বলল, ‘কোনো বিষয় নয়, চলো বাইরে কোথাও খেয়ে আসি।’ মামুনের কাজ খুব ভালো লাগে। আরো ভালো লাগে শিল্পের প্রতি ওর বোধ, নিমগ্নতা। ও শিল্পের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ আমাদের পথচলা সময়ের। একে অন্যের কাজকে আমরা খুব রেসপেক্ট করি, প্রেরণা দেই, কঠোর সমালোচনাও করি দু’জন দু’জনের। দু’জনের ভিন্ন মতাদর্শনও ঘটে কখনো কখনো। সেটাও আমরা খুব রেসপেক্ট করি। আমরা দু’জনই শিল্পের প্রতি খুব সংবেদনশীল, নিমগ্ন। এ কারণে আমরা দু’জনই নিজ ইচ্ছায় সন্তান গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেই, যা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। নিত্য বন্ধুত্ব আমাদের। আমি ছবি আঁকতে নিমগ্ন, হয়তো খুবই চা খেতে মন চাইছে। হঠাৎই দেখি চায়ের কাপ হাতে চা বানিয়ে মামুন দাঁড়িয়ে আছে। খুব ভালো চা বানায় সে। আবার ও যখন নিমগ্ন, আমিও বুঝতে পারি ওর ঠিক কী লাগবে। শিল্পীসত্তার এই বন্ধুত্বের বন্ধনটা আমরা খুব উপভোগ করি। দু’জনের কনসেপ্ট ভিন্ন, ভিন্ন কাজের মাধ্যমও। তবু নিরন্তর সমালোচনা, বাস্তবতা ছাপিয়ে প্রেরণা ঠাঁই পায় শিল্পবন্ধুর অবয়বে। প্রেমে, শিল্পে, সঙ্কটে যা অবিচল!

প্রশ্ন : আপনার এবারের প্রদর্শনীতে কী ধরনের কাজ থাকবে একটু বলবেন কি পাঠকদের জন্যে?
দিলারা বেগম জলি : যাপিত জীবনের নিদারুণ বাস্তবতা ও তার প্রতিচ্ছবি আমাকে খুব স্পর্শকাতর করে তোলে। সেই আবেগ আমাকে শিল্পের কাছে দায়বদ্ধ করে তোলে। শিল্প কতটা বিপ্লব ঘটাতে পারে জানি না; কিন্তু শিল্পচর্চার মধ্যে জীবনের গল্প বলা বা সত্যকে খুঁজে ফেরার মধ্যেই আমি অনেক না বলা কথা অথবা যা বলতে চাই বা অনেকে যা বলতে পারেনি সেটি তুলে ধরতে চাই। জীবন ও জীবিকার জন্যে গার্মেন্টস কর্মীদের জীবন-যুদ্ধ ও তাদের কথা উঠে এসেছে আমার সাম্প্রতিকতম কাজে। এবার ৩০টির মতো ড্রইং, ইনস্টলেশন, ভিডিও, ভিডিও পারফর্মিং, ‘উই’য়ের ফুটেজ থাকবে। ‘তাজরিননামা’র একটি ভিডিওচিত্র থাকবে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রের খবর, যাপিত জীবনের অসহায়ত্ব, নারীর প্রতি বা মানবতার প্রতি সহিংসতা আমার কাজের উপজীব্য অনুষঙ্গ। শিল্পের মাধ্যমে আমি কথাগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি! আমার অনুভূতি ও প্রকাশের ক্ষেত্রে যে মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্য বোধকরি সে মাধ্যমেই আমি কাজ করি। শিল্পসাধনার অন্তর্লোকের অনুসন্ধানই আমার শিল্প প্রকাশ ও শিল্পীমানসের একান্ত ব্যঞ্জনার গল্পকথা, যা খুঁজে ফিরি নিরন্তর, নারীসত্তার দৃশ্য-বাস্তবতায়!!!

 

Source: Charbela Chardik

Enter your keyword