শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী

নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের অন্যতম প্রবীণ চিত্রশিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী মূলত রোমান্টিক ধারার এক শিল্পী। শেষ সত্তরে এসেও তিনি অত্যন্ত সৃষ্টিশীল। তিনি ঢাকার তৎকালীন চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে স্নাতক লাভ করেন ১৯৬০ সালে। কমার্শিয়াল আর্ট বা গ্রাফিক ডিজাইনে স্নাতক অর্জন করলেও দ্রুত তিনি সৃজনশীল চিত্রশিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯৮৩ সালে অনুষ্ঠিত তাঁর প্রথম একক চিত্র-প্রদর্শনীটি সেদিক থেকে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিকে তিনি প্রাকৃতিক নিসর্গ, গ্রামীণ জীবন ও নাগরিক বিষয়নির্ভর তেলরং ছবি আঁকতে উদ্যোগী ছিলেন। তখন তাঁর ক্যানভাসে বিন্যাস ছিল খুব জমাট, রং ছিল গাঢ় ও মিশ্র, আঙ্গিক কিউবিস্ট ধারার। সে-সময় তাঁর সমকালীন অন্য শিল্পীরাও অনেকে প্রায় একই আঙ্গিকে শিল্পচর্চা করতেন। পরবর্তী তিন দশকে তিনি নিজেকে ক্রমাগত বিবর্তিত করেছেন, বিষয় নির্বাচনে, রং-ব্যবহারে এবং উপস্থাপনার আঙ্গিকে। সাদৃশ্যমূলক দৃশ্য-বর্ণনার চাইতে সাংকেতিক আকার বা প্রতীকের দিকে ঝুঁকেছেন বেশি, নানা রকম জ্যামিতিক আকার, ছোট ছোট ত্রিভুজই তাঁর বেশি পছন্দের, বা চতুষ্কোণ আকারও ব্যবহার করেছেন। এসব আকার বা ফর্মের উৎস হয়তো ঘুড়ি এবং গ্রামের নানা উৎসব অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত নানা আকৃতির রঙিন কাগজের সাজসজ্জা। সরু রশি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা সেই সব কাগজের সজ্জা, ত্রিভুজ-চতুষ্কোণ ও রশি বা সুতার টানা, এগুলোই ছিল সমরজিতের চিত্রকলার কম্পোজিশনের অনন্য প্রেরণা। কখনো ক্যানভাসের নিচের দিকে বা কোনাকুনিতে হালকা রেখায় শিশু-চিত্রকলার আদলে আঁকা নর-নারী ও শিশুদের উপস্থিতি। এ পর্যায়ে তাঁর রং-নির্বাচন ছিল হালকা ও মিশ্র। প্রাথমিক রঙের ব্যবহার কম। ক্যানভাসে বিস্তর খোলা জায়গা রাখেন, যেন ঘুড়ি উড়াবার জন্য বিশাল আকাশের প্রতীক। অনেকটা এভাবেই ছবিতে তাঁর নিজস্ব আঙ্গিক তৈরি হয়েছে। তাঁর আরেক ধরনের ছবিতে বিন্যস্ত হয়েছে কৃষিজমির ব্যবহার, নানা রঙের আয়তাকার বা বর্গাকার ছোট-বড় ক্ষেত্র, ওপর থেকে দেখা দৃশ্য। এসব ছবির সামগ্রিক চরিত্র পল ক্লি’র কোনো কোনো কাজের মতো, তারপরও ভিন্নতা অবশ্যই আছে। গ্রামীণ দৃশ্যাবলি, বিশেষ করে তাঁর শৈশবের স্মৃতি-জাগানিয়া বা নস্টালজিক দৃশ্যাবলি এবং উপকরণাদি অনুপ্রাণিত করেছে সমরজিৎকে। আবার তাঁর নিজের দীর্ঘদিনের আবাস যে ঢাকা শহর, সেই শহরও তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। পুরনো ঢাকার বিষণœ বাস্তবতা তাঁর ছবিতে আশ্চর্য বর্ণীল ও উচ্ছলতা নিয়ে ধরা দিয়েছে। বর্তমান শতাব্দীর শুরু থেকেই সমরজিৎ অধিকতর মানব-মানবী ও পাখিনির্ভর ছবি এঁকেছেন। এক্ষেত্রে উপস্থাপনায় ভারী কালো রেখা ও উজ্জ্বল রং ব্যবহার করেন। ক্ষেত্র বিভাজনে জ্যামিতিকতার গুরুত্ব বেড়েছে।
বর্তমান একক প্রদর্শনীতে সমরজিৎ অনেক বেশি উচ্ছল ও তারুণ্যময়। কম্পোজিশন আগের তুলনায় জটিলতর। রং-নির্বাচনেও সাহসী, লাল, নীল, সবুজ, হলুদ প্রভৃতি রঙের নিরীক্ষাধর্মী ব্যবহার। ঘুড়ি এখনো প্রতীকী ফর্ম, তবে নদী, নৌকা, ফসলের মাঠ, মানব-মানবী, পল্লী বা নগরের বাস্তু-নির্মাণ – এসবও শিল্পীর মনোযোগ লাভ করেছে। ক্যানভাসে দাবার ছকের মতো নানা রঙের অসংখ্য ছোট বর্গক্ষেত্র বা নানা দেশের পতাকা ও ছোট ছোট নানা প্রতীকের সমাবেশ ঘটান। বিস্তীর্ণ পটভূমিতে নৌকা কিংবা ঘুড়ি প্রতীকী নকশা আকারে উপস্থাপিত হয়, মানব-মানবী বরং মুখ্য ভূমিকা লাভ করে। সমরজিৎ যে একজন দক্ষ ডিজাইনার তার প্রমাণ এই ধারার চিত্রকর্মসমূহ।
তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে সমরজিৎ কোনো মতাদর্শ প্রচার বা সামাজিক বক্তব্য জানানোর প্রয়াস পাচ্ছেন, এমন মনে হয় না, একেবারেই নান্দনিক রূপ উপস্থাপনই সম্ভবত তাঁর লক্ষ্য। নিসর্গ ও মানুষই তাঁর প্রিয়। ইদানীং ছবিতে বুনট বা টেক্সচার নিয়েও কিছু নিরীক্ষা করেছেন। তবে মূলত রোমান্টিক মানসিকতা নিয়েই সমরজিৎ কাজ করেন। আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যে তিনি বিংশ শতাব্দীর আধুনিক শিল্প প্যারাডাইমে নিজেকে আন্তরিকভাবে সীমিত রেখেছেন এবং সে-আঙ্গিকেই তিনি অর্থপূর্ণ চিত্রকলা সৃষ্টি করেছেন – যে চিত্রকলা দর্শককে আনন্দ দেয়, ভাবিত করে এবং দেশ ও কালের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাখে। লক্ষণীয়, সমরজিৎ রায় চৌধুরী শিল্পকলা শিক্ষালাভ করেছেন শুধু ঢাকার চারুকলা কলেজে। পাশ্চাত্য ধারায় মূলত ছবি আঁকলেও তিনি পাশ্চাত্যের কোথাও শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেননি, এমনকি সম্ভবত ২০০০ সালের আগে কখনো ভ্রমণসূত্রেও দূরপ্রবাসে যাননি। তাঁর শিল্পার্জন একান্তই নিজস্ব ।
সাতাত্তর বছর বয়সে যে প্রদর্শনী তিনি উপহার দিচ্ছেন, তাতে আমরা যেমন বিস্মিত হই, তেমনি ভীষণভাবে আশান্বিত হই, এই পরিণত শিল্পী আরো দীর্ঘদিন তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবেন। শিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সুপারনিওমারারি প্রফেসর হিসেবে বর্তমানে একনিষ্ঠভাবে শিক্ষকতা করছেন ও নানা মাধ্যমে তাঁর শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। অত্যন্ত আনন্দের বিষয়, এ-বছরই তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার ও বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক লাভ করেছেন। বেঙ্গল শিল্পালয়ে তাঁর বর্তমান প্রদর্শনী এ কারণে বিশেষ তাৎপর্যবহ ও অভিনন্দনযোগ্য।

Enter your keyword