মানুষের আগ্নেয় উত্থান

বেগবান তেজস্বী মানুষ শাহাবুদ্দিনের শিল্পসৃষ্টির প্রেরণার উৎস বেগ ও তেজকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন মানুষের দেহে। তবে মানুষের দেহই তাঁর গতি পর্যবেক্ষণের একমাত্র বিষয় নয়, অন্য প্রাণীর অভিব্যক্তি এঁকেও তিনি গতির অনুশীলন করেছেন। অপরাজেয় বেগে চালিত ঘোড়াদের দৌড়, ব্যাঘ্রমুখের ভয়ংকর প্রকাশ এঁকেও রক্তের রাগের ক্ষুরধার পরিস্থিতি দর্শককে অবলোকন করাতে চেয়েছেন শিল্পী।

যুদ্ধে অবতীর্ণ মানুষ, প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ মানুষ, প্রতিবাদে -প্রতিরোধে বুক চিতানো ঊর্ধ্ববাহু মানুষ; শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে চিত্রিত হয়েছে মানুষের বিচিত্র উত্থান। আক্রমণের প্রাক্‌-মুহূর্তের হুংকার এবং বিজয়ের উলস্নাস, দুই-ই একক যোদ্ধার বিস্ফারিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে কিংবা সমবেত যোদ্ধাদের বিজড়িত দেহ এঁকে তিনি শনাক্ত করতে চান। কেবলই ধাবমানতা, রক্তিম দেহের তাপ, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস, সব মিলিয়ে গতির নতুন পুরাণ রচিত হয়েছে তাঁর কাজে। শাহাবুদ্দিনের চৈতন্যে কখনো কোনো স্থবির-জাতক জন্ম নেয় না। তাঁর স্পেসে সমুত্থিত মানুষেরা মহাকাব্যের বিপুল পরিধির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই স্পেসে মূলত জয় ঘোষিত হয়েছে, রচিত হয়েছে ট্র্যাজিক উলস্নাস। আহত-বিক্ষত মানুষের করুণ গোঙানিও রয়েছে। তবে মৃত্যুপথযাত্রী বীরের মুখে বিপন্ন-পরাস্ত হওয়ায় হতাশার ব্যঞ্জনা নেই। যাতনা আছে; ক্ষুব্ধতা আছে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু নিথর লাশ এঁকে মৃত্যু উলিস্নখিত হয়নি। কেননা শিল্পী আশাবাদী চেতনা লালন করেন এবং তিনি একদা যে প্রতিজ্ঞা নিয়ে স্বদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন সেই অঙ্গীকারের অঙ্গার এখনো ধিকিধিকি জ্বলছে তাঁর অন্তরে। তিনি এখনো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারেননি। তাই তাঁর যুদ্ধ সচল রয়েছে। ছবি আঁকাটা শাহাবুদ্দিনের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে সজীব-সবলভাবে বেঁচে থাকার বিষয়। তবে শুধু যুদ্ধ বা যোদ্ধা নয়, যেখানেই তিনি মানুষি শক্তির জাগরণ দেখেন, ছন্দময় প্রকাশ পর্যবেক্ষণ করেন, শক্তির পরাকাষ্ঠা প্রত্যক্ষ করেন তাকেই শৈল্পিক ভাষ্য দিতে চান। তবে বেদনায় বিদীর্ণ অবয়বেও প্রকাশের খরবেগ দেখতে পেয়েছেন তিনি। এই উপমহাদেশের তত্ত্বগত শাস্ত্রের বিচারে শিল্পী মূলত রুদ্র ও বীর-রসের সংক্রমণ ঘটিয়েছেন তাঁর কাজে। সৃজনশীল মানুষের এই উদ্দামতা আমরা অনুভব করেছি বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়।

 

 

Moinuddin Khaled

Enter your keyword