তরুণ ঘোষ

সংগ্রাহকের কথা
আমার জন্ম ১৯৫৪ সালে। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে আমার বাবা পুলিশ বিভাগে চাকরি করতেন। বাবা মারা যান যখন আমার বয়স মাত্র এক বছর। আমাদের বাড়ি সোনারগাঁ, পানাম শহরের কাছাকাছি।
লোকশিল্পের প্রেরণাটা শুরু হয় স্কুলজীবন থেকে। স্কুলে আমার এক বন্ধু ছিল অনিল পাল। রথের মেলা, দুর্গাপূজার মেলা, এসব মেলাতে অনিলদের বাড়িতে তৈরি হতো লোকজ উপাদানের নানা কিছু। ওদের বাড়ির উঠানে বসেই দেখতাম তাদের কাজ এবং সেগুলো আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করত। আমি সংগ্রহ করি সেই শিশুকাল থেকে কিন্তু সেগুলো তো এখন আর নেই। একসময় আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন মেলায় গিয়েছি জিনিস সংগ্রহ করতে – ফরিদপুর, ভাঙ্গা, বালিয়াকান্দিতে। এভাবে সংগ্রহের একটা নেশা তৈরি হয়ে গেল।
ছবি আকার ক্ষেত্রে এই সংগ্রহ আমাকে নানাভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
১৯৭৪-এর দিকে আমরা যখন ছাত্র, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আমাদের সঙ্গে সোনারগাঁ জাদুঘরে গিয়েছিলেন। তখন ওখানে লোকশিল্প সংগ্রাহক সাইদুল ভাই (মোহাম্মদ সাইদুর রহমান) ছিলেন। তাঁকে বললাম যে, আমিও সংগ্রহ করি, আমাকে আপনার সঙ্গে নিয়ে চলুন। আমরা দুবার কিশোরগঞ্জ যাই। সেখানে কিশোরগঞ্জের একটু ভেতরের দিকে কিছু পুতুলশিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকে আমিও কিছু পুতুল সংগ্রহ করি।
আমি যখন বরোদায়, আমাদের পুতুল দেখে (গুজরাটের চিত্রশিল্পী) গোলাম মোহাম্মদ শেখ বললেন, ‘বেঙ্গলকা ফোক আর্ট বহুত আচ্ছা হ্যায়। হামারা লিয়ে কুছ লে কে আনা।’ তাই আমি যখন যেতাম তখন কিছু নিয়েই যেতাম। এভাবে তাঁর সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। একটা সময়ে তিনি সম্মত হলেন লোকশিল্প নিয়ে একটা গ্রুপ রিসার্চ করার। আমার তখন মাস্টার্স হয়ে গেছে, তবু আরো দেড় বছর ছিলাম শুধু ওই রিসার্চের জন্য। এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে আমরা মেদেনীপুরের পটচিত্র, বেঙ্গলের পটচিত্র সংগ্রহ করতাম। শিল্পীদের নিয়ে আসতাম বরোদায় এবং তাঁদের সঙ্গে আলোচনা হতো। তাঁরা কাজ করতেন এবং সেগুলো নিয়ে প্রদর্শনী হতো। নানা অঞ্চলের ফোক আর্ট সমন্বয় করাটাও আমাদের কাজ ছিল। আমরা সারা ভারতে ঘুরে বেড়ালাম এই সংগ্রহ করতে এবং ডাটাবেজ তৈরি করার জন্য। কিন্তু এই চর্চার জন্য একধরনের কালচার প্রয়োজন। একজন শিল্পী যদি একটা জিনিস সংগ্রহই না করে, তার ঐতিহ্যই না চেনে, সে কীভাবে শিল্পী হয়। আবেদিন স্যার বলতেন, ‘যেখানেই যাবে, সেই অঞ্চলের একটা জিনিস নিয়ে আসবে। মনে রাখবে, সে-অঞ্চলের একটা দইয়ের হাঁড়িও লোকশিল্পের উপাদান।’ যেমন, কিশোরগঞ্জের পুতুল Ñ আমি দেখলেই বলে দিতে পারি যে সেগুলো ওই অঞ্চলের। কিশোরগঞ্জের পুতুল খুব আর্টিস্টিক ছিল। আমার মনে হতো, ময়মনসিংহ অঞ্চলের যে পুতুল সেটা আর কোথাও হয় না। নিকলীর পুতুল আর ময়মনসিংহের, কিশোরগঞ্জের পুতুল আবার এক না। এরকম করে নানা রকমভাবে পার্থক্য করা যায়।
সাধারণত লক্ষ্মীপূজায় সরা আঁকা হয়। লক্ষ্মীর সরাটাই একটা আর্টওয়ার্ক! পটচিত্র আঁকার যে শৈলী, সেটা আমরা দেখতে পাই লক্ষ্মীর সরাতে, বিশেষ করে ফরিদপুর অঞ্চলে। ফরিদপুর, রাজবাড়ী, পাটুরিয়া এসব অঞ্চলের সরা কিন্তু বিভিন্ন রকম। যশোরের সরা আরেকটু ভিন্ন। এসব কীভাবে হলো? পাল সম্প্রদায়ের
বিয়ে-শাদিতে এই যে এক পরিবারের সঙ্গে আরেক পরিবারের সম্পর্ক তৈরি হয়, সেখান থেকে একটা স্টাইলের আদান-প্রদান হয়। সরার ক্ষেত্রেও তাই আমরা নানারকম পার্থক্য দেখতে পাই। আমাদের ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে গেছে, কারণ সঠিক লিখিত ডকুমেন্টেশন নেই। তাই আমরা আসল তথ্য জানতে পারি না। লোকশিল্পের উপাদানে যে ফর্ম বা শেইপ থাকে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চারুকলা ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নকালে তরুণ ঘোষ বাস্তবধারার কাজের জন্য শিল্পানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা পেইন্টারস গ্রুপ গঠন করেন।
তরুণ ঘোষ ১৯৮২ সালে উচ্চতর চিত্রশিক্ষা গ্রহণের জন্য বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই শিল্পশিক্ষা তাঁর মানসভুবনকে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করে। তিনি এই সময়ে নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন হন। লোক-গবেষণা প্রকল্পের কাজে যুক্ত হওয়ার ফলে পটুয়াদের কাজের ধারা ও প্রকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
বরোদা থেকে দেশে ফিরে আসার পর তিনি লোক-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেন। বেহুলা ও মনসাকে নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে অসংখ্য চিত্রের অঙ্কন তখন থেকেই শুরু হয়। রেখার বলিষ্ঠতা, রঙের ব্যবহার ও মানবিক সম্পর্কের কারণে তাঁর এই সৃষ্টিগুচ্ছ হয়ে ওঠে অনন্য।
১৯৯৭ সালে তিনি এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে গ্র্যান্ড প্রাইজ অর্জন করেন। ওই বছরেই তিনি জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে আরব-বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৭৭ সালে বিএফএ ডিগ্রি ও ভারতের বরোদার এমএস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
তরুণ ঘোষ ১৯৫৩ সালে রাজবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। জাতীয় জাদুঘরের সমকালীন শিল্পকলা বিভাগের ডেপুটি কিপার ছিলেন। বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করলেও নিয়মিত চিত্রচর্চা করে চলেছেন।

Leave a Reply

Enter your keyword