নারীর পজিটিভ পাওয়ার আমাকে মুগ্ধ করে : রোকেয়া সুলতানা

নন্দিত চিত্রশিল্পী রোকেয়া সুলতানা। দেশের মানচিত্র ছাপিয়ে যিনি স্বনামখ্যাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, প্রতিনিয়ত মগ্ন শিল্পচর্চায়। অংশ নেন স্বদেশ ও বিদেশের নানা চিত্রপ্রদর্শনীতে। তার চিত্রমালায় নারী, মাতৃত্ব, প্রকৃতি, সম্পর্ক বর্ণাঢ্য হয় স্বকীয় বর্ণপ্রভায়। শিল্পী রোকেয়া সুলতানা চারবেলা চারদিক-এর সঙ্গে এক ভিন্ন মেজাজের আবাহনে।
সূত্র ধরালেন : রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনী।

প্রশ্ন : আপনার শিল্পী হয়ে ওঠার কথা জানতে চাই।
রোকেয়া সুলতানা : আসলে ছোটবেলা থেকেই আমি ছবি আঁকতাম, গান গাইতাম। আমার বোনেরা গান গাইত, ছবি আঁকত। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। বদলির চাকরি সূত্রে আমরা বাংলাদেশ, পাকিস্তান সব জায়গাতেই থেকেছি। মা-বাবার জীবনযাপনের শৃঙ্খলা, উদারতার সঙ্গে যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা হলো, মেয়েদের জন্যে ঠিক ছেলেদের মতো করেই একইভাবে শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রেরণা দেয়া। তাই ছোটবেলা থেকেই নারী-পুরুষের ‘সমতা’ বোধ কাজ করত। দীর্ঘদিন রাওয়ালপিন্ডিতে ছিলাম। গান, ছবি আঁকা এসব ছিল আমাদের বাড়িতে ভীষণভাবে চর্চিত। আমি ভালো গান গাইতাম; কিন্তু ছবি আঁকাটা অন্য রকম লাগত। প্রকৃতি ও বোধের মধ্যে থাকতে পারার এক বিস্ময়কর আনন্দ খুঁজে পেতাম। ছবি আঁকার আনন্দ, ভালো লাগা সবকিছু ছাপিয়ে যেত। এভাবেই চিত্রকলা আর আমি কখন যেন একাকার হয়ে গেছি। ছোটবেলা থেকে পুরস্কার পেতে থাকি। এরপর ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে পড়ে শান্তিনিকেতন চলে যাই। এরপর শিক্ষকতা শুরু করি ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউটে, যা এখনো বহমান।

প্রশ্ন : এই চিত্রচর্চা, শিক্ষাগ্রহণ- এসবের মধ্যে ব্যক্তি জীবনের কথা, বিয়ে ও মাতৃত্ব থাকে, যা এই জীবনের এক কঠিনতম অধ্যায়। আবার অত্যন্ত কাক্সিক্ষত এক বাস্তবতা। কীভাবে এই ভারসাম্যকে সফলতার বিন্দুতে আনলেন, নিজের কাজকে বাধাগ্রস্ত না করে?

রোকেয়া সুলতানা : জীবন প্রবাহের স্রোত কখনোই মসৃণ নয়। সবারই সংগ্রাম, চড়াই-উতরাই, বাধা আছে। সেটি নিয়েই আমাদের পথচলা। শান্তিনিকেতনে পড়ার শখ ছিল আমার। বিয়ের পর গিয়েছিলাম। অবশ্যই খুব সহজ ছিল না। কিন্তু জীবনের কাছে সততা এবং একাগ্রতার এক অসীম মূল্য আছে। আমার জীবনসঙ্গী ওমর খালিদ রুমি। সে একজন ক্রিকেটার ছিল। গান করে, লেখে, খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত তার জীবন। দুটি জীবনের সমন্বয়, দুটি পরিবারের স্বজন-সম্পর্ক অতঃপর আমাদের সন্তান ‘লারা’র জন্ম। এসবের মধ্যেই শিল্পীসত্তার অস্তিত্ব! সে এক নিরন্তর লড়াই বলব সব শিল্পীর জন্যেই। তবে ‘মাতৃত্ব’ এক অপার আনন্দ, এক অনিন্দ্য সৃজন, অমিত সৃষ্টি সুখের উদ্ভাস! লারার জন্মের পর আমার নিজের মধ্যেও এক অলৌকিক জন্ম হলো, মাতৃত্বের আশ্চর্য সুখ আমার শিল্পী জীবনকে পরমভাবে সমৃদ্ধ করল। আমার ছবি আঁকার বিষয়, স্টাইল সবকিছুতেই এর ‘পজিটিভ’ প্রভাব পড়ল বা গভীরভাবে ইনফ্লুয়েন্সড হলো। সে সময় থেকে ‘ম্যাডোনা’ সিরিজের কাজ শুরু হয়েছিল। নারী খুব পাওয়ারফুল সত্তা। আমাকে নারীর পজিটিভ পাওয়ার প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। আমার মাকে দেখেছি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সংসার-সন্তানদের বড় করেছেন। নিজের জীবনের সৃজনশীলতা সবটাই আমাদের দিয়েছেন, হয়তো নিজে বিশিষ্ট হননি। কিন্তু এই যে স্যাক্রিফাইস সেটা কেন ছিল? সেটার অন্তরালে ওই পজিটিভ থিংকিংটাই প্রায়োরিটি পেয়েছে। তাই ‘নারী’রা কিন্তু সহজাতভাবেই সমৃদ্ধ, সৃষ্টিশীল এবং যোগ্য। নারী-পুরুষের বিভাজনের বিতর্ক নয়, মানুষ হিসেবে সবার সম্মান ও অধিকারের সমতার প্লাটফরমটা খুব জরুরি, যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যেই ভারসাম্যের বিষয়, জীবনের এক অন্যতম নন্দিত দর্শন।

প্রশ্ন : নারী শিল্পীদের ছবি নিয়ে জানতে চাই। নারী শিল্পীদের কাজে ‘নারী’ বেশি চলে আসে অথবা নারী চরিত্রগুলো। আর ‘নারী’ শিল্পীদের বিভিন্ন সংগঠনও দেখা যায়। একজন শিক্ষক ও শিল্পী হিসেবে বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

রোকেয়া সুলতানা : বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্পী কিন্তু ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করা যায় না। শিল্পীর অস্তিত্ব বোধে। টেকনিক্যালি শেখানো যায়; শিল্পীর সৃষ্টি কিন্তু ‘সেরিব্রাল’। মেয়েরা যে ‘নারী’ বিষয় নিয়ে কাজ করে নিশ্চয়ই সেখানে তীব্র বাস্তবতা আছে। সবার জীবনের বাস্তবতা এক নয়। ‘নারী শিল্পীদের সংগঠন আছে। ‘নারী’ বিষয়টি সেনসিটিভ। নারীদের ওপর যে অন্যায় বা যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে এসবই বাস্তবতা। তবে শিল্পীসত্তার নারী-পুরুষ আমি বিশ্বাস করি না। ‘শিল্পী’ শিল্পীই। যারা ‘নারী’ নিয়ে কাজ করেন হয়তো সেই বিষয় দ্বারা তারা ইনফ্লুয়েন্সড! এটা হতেই পারে। এ বিষয় ভিত্তিকতার জন্যে ‘শিল্পী’সত্তার বিভেদীকরণটা আমি ঠিক মনে করি না; বরং এটা সম্পৃক্তকরণই স্বাভাবিক বলে মনে করি।

প্রশ্ন : বিভিন্ন সময়ে আপনার কাজের বিষয়, রঙ বা রূপ কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। আপনি কি বলবেন আপনার শিল্পকর্ম নিয়ে?
রোকেয়া সুলতানা : আমাদের সময়ে আমরা যা-ই করেছি পুরোপুরি ডেডিকেশন দিয়ে করেছি। শিল্পচর্চার কোনো শর্টকাট ওয়ে ছিল না। ‘সময়’ একটা বিষয়। অর্থাৎ একজন শিল্পীর বোধ ও মননে কী স্পর্শ করছে, প্রভাবিত করছে। আমি একটু নির্জনতা ও মগ্নতা বিলাসী। যতটা কাজ করি, ভাবি তার থেকে অনেক বেশি। ছবি আঁকাটা আমার কাছে ফ্লোইং রিভারের মতো, যেখানে গতি ও সময়ের ধারা আছে এবং অবশ্যই প্রতিদিনের ডায়রির মতো। প্রতিদিনের ডায়রির কথকতা আমার ক্যানভাসে সঞ্চারিত হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে মনের অন্তর্যাত্রার প্রভাব এতে পড়বেই। তবে আমি অনেক ভাবি। ভেবেই কাজগুলো করি। একজন শিল্পীর জীবনযাত্রা, চেতনা, দর্শন, বোধের রিফ্লেকশন তার কাজে পড়ে। টেকনিক্যালি করণ-কৌশল জানার একটি পর্যায় আছে। কিন্তু উত্তরণ এর উৎসে ‘দর্শন’ ও ‘সেরিব্রাল’ একেকটা গুরুত্বপূর্ণ। রঙ আমাকে খুব প্রভাবিত করে। আমি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রঙের প্রতি অনুরক্ত হয়েছি, সেটাও ওই মনের প্রভাব। তাই ‘শিল্প’ বিষয়টা কেবল দর্শনধারী নয়, এর ভেতর আছে অন্তর্নিহিত সমুদ্রের অতলতা, গভীর মগ্নতাতেই তা অনুধাবন সম্ভব।

প্রশ্ন : স্বদেশে ও বিদেশে আপনার অজস্র অর্জন, সুনাম-খ্যাতি, সম্মানা। আপনি কীভাবে একজন শিল্পীর সফলতাকে দেখেন?
রোকেয়া সুলতানা : যা কিছু অর্জন সেটা আমার প্রেরণায় শক্তি দেয়। কিন্তু ‘আমি’, ‘আমি’ কথাটার চেয়ে আমাদের কথাটার গুরুত্ব বেশি দেই। যদি কোনো সফলতা থাকে সেটা আমার একার নয়, আমার শিক্ষক, ছাত্র, সহকর্মী শিল্পী সবার। একজন শিল্পী যখন ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ায় তাকে এক বিশেষ ‘পাওয়ার’, অন্তর্শক্তি বা স্পিরিচুয়াল পাওয়ার নিয়ে দাঁড়াতে হয়। নিরন্তর কাজ করে যাওয়ার সেই পাওয়ারকেই আমি সফলতা বলব। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সেই ‘জার্নি’কে নিজস্ব সৃষ্টির প্রণোদনায় সচল রাখাটাই শিল্পীর জন্যে বড় সাফল্য। সব শিল্পীর কাছেই ‘কাজ’ করে যাওয়াটাই জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের বার্তা। আরেকটি বিষয় বলব, কোনো সাফল্য নিয়ে যদি কেউ ভেবে ফেলে আমি অর্জন করেছি, পেয়েছি তখনই সৃজনসত্তার মৃত্যু হয়। সৃষ্টির প্রথমেই ‘ইনোসেন্স’ থাকে। অর্থাৎ আমি একটি জিরো পয়েন্ট থেকেই ক্যানভাসের মুখোমুখি দাঁড়াতে দায়িত্ববোধ মনে করি। যেখানে শিল্পী আমি দাঁড়াই, শিক্ষক নই। আমার অনুজপ্রতিম অনেকের কাছে আমি শিখি। ছাত্রদের কাছ থেকেও শিখি। জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার কাছে খুব প্রাধান্য পায়। আমার কাছে আমার ছাত্রদের গুরুত্ব খুবই বেশি। আর আমার শিক্ষক কিবরিয়া স্যার এর আদর্শ!

প্রশ্ন : দীর্ঘ আপনার শিল্পীজীবন। আপনার কাছে বাংলাদেশের শিল্পচর্চা, সম্ভাবনা ও সাফল্য নিয়ে জানতে চাই।

রোকেয়া সুলতানা : শিল্পচর্চায় বাংলাদেশ কতটা উর্বর, কতটা উজ্জ্বল সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। শিল্প ইতিহাসের সমৃদ্ধ ধারা বহমান; কিন্তু বর্তমানেও আমাদের নতুন ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক মানের কাজ করছে। শিল্পের প্রসার, প্রচার ও প্রকাশেও যুক্ত হয়েছে নতুন ধারা। নানা রকম এক্সপেরিমেন্টাল কাজ হচ্ছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এসেছে। তবে এই ক্ষেত্রটিকে আরো অনেক বেশি উজ্জীবিত করা যায়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেখানে আমাদের ছেলেমেয়েরা আধুনিক সুবিধাগুলো পেতে পারে, এগিয়ে যেতে পারে আরো দৃপ্ত পথে। কারণ শিল্প কিন্তু প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক বেশি সফলতার স্বাক্ষর রাখে। বাংলাদেশের শিল্পচর্চা আরো অন্য মাত্র নিতে পারে, যা বিশ্ব দুয়ারে বাংলাদেশকে অন্য মাত্রায় উত্তীর্ণ করতে পারে।

প্রশ্ন : আপনি অনেকের কাছে স্টাইল আইকন। কী বলবেন স্টাইল স্টেটমেন্ট নিয়ে?

রোকেয়া সুলতানা : তাই কি? এটা জানতাম না। আমার কাছে ‘রঙ’ খুব গুরুত্ব পায়। দিন, সময় আর কোথায় কী পড়ছি। কাজের সময়, ট্রাভেলিংয়ে প্যান্ট-টপস-শার্ট কমফোর্টঅ্যাবল লাগে। এছাড়া সালোয়ার-কামিজ আর টপ ফেভারিট শাড়ি। নিজেকে সুন্দর করে রাখার মধ্যেও সুন্দর বোধ, ভালো লাগা কাজ করে। জীবনের এই ছোট ছোট ভালো লাগাও সৃষ্টির অন্তরালে প্রেরণা জোগায়। তবে পুরোটাই নিজস্ব। সবচেয়ে সুন্দর ‘রূপ’ মানুষের সুন্দর মন, ব্যবহার, যা সব ফ্যাশনের ঊর্ধ্ব গিয়ে মানুষকে সত্যিই সুন্দর করে তুলতে পারে। জাঙ্ক জুয়েলারি ভালো লাগে আর সাজটাও এক রকম রাখি না। ক্যানভাসের রঙের মতোই ইচ্ছেমাফিক করি। একটা মাত্রাবোধ আমার ভালো লাগে।

প্রশ্ন : আপনি ও আপনার জীবন-বন্ধু এবং আপনার রান্না, লাইফস্টাইল নিয়ে কী বলবেন? আর রোমান্টিকতা?

রোকেয়া সুলতানা : ওমর খালিদ রুমির সঙ্গে সম্পর্কের বোঝাপড়াটা একটু বেশি মাত্রার বন্ধুত্বপূর্ণ। ওর কাজ আমি বুঝি, আমার কাজ ও বোঝে। আমাদের জীবনের অলৌকিক সুন্দর প্রাপ্তি আমাদের মেয়ে ‘লারা’। লারাকে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন, আমাদের ভালো লাগা। আর এখন লারার বিয়ে হওয়ায় আমরা একটি ছেলেও পেয়েছি। সম্পর্কে স্পেস ও রেসপেকট দিতে হয়। আর রোমান্টিসিজম তো জীবনের নির্যাস। যেমন গতকাল খুব বৃষ্টি ছিল। ইচ্ছে হলো গান শুনতে অতঃপর একটি ছবি নিয়ে মগ্ন হয়ে গেলাম। অর্থাৎ নির্মাণ ও সৃষ্টিতে যা প্রেরণার স্বর্গ হয়ে দাঁড়ায় তাকেই রোমান্টিসিজম বলা যায়। আগে খুব রান্না করতাম। এখনো করি। তবে এখনকার মেন্যুতে ডায়েট চার্টই প্রাধান্য পায়। ওমর খালিদ রুমি খুব ফাস্টফুডের ভক্ত। প্রায়ই বাইরে থেকে খেয়ে এসে সে আমার সঙ্গে খেতে বসে। কম খাচ্ছে, বুঝে ফেলি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে।
পুনশ্চঃ শিল্পী রোকেয়া সুলতানার হাসিতে উদ্ভাসিত হলো পুরো বিকেল যেন। একজন সার্থক ও নন্দিত শিল্পীর সরলতার সৌন্দর্যের বিভা ছড়িয়ে থাকে তার সৃষ্টিতে, জীবন এবং জীবন দর্শনের প্রেরণা হয়ে। নারী দিবসে তাকে শ্রদ্ধা ও শুভ কামনা।

 

Source: Charbela Chardik

Enter your keyword